Logo

ডিপিডিসির এমডি’র চেয়ারে বসছে স্বৈরাচারের দোসর

profile picture
বশির হোসেন খান
১৭ মে, ২০২৬, ১৩:৩৮
ডিপিডিসির এমডি’র চেয়ারে বসছে স্বৈরাচারের দোসর
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

রাষ্ট্রের অন্যতম বিদ্যুৎ বিতরণী প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগকে ঘিরে বিদ্যুৎ খাতে ফের শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, লবিং ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি থেকে এখনও বের হতে পারেনি বিদ্যুৎ খাত।

বিজ্ঞাপন

বরং নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই পুরোনো বলয়ই আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গতকাল শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৯ জন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা। তারা হলেন, ডিপিডিসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক(অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলাম, কুমিল্লার পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোঃ তোফাজ্জল হোসেন প্রামাণিক, ইজিসিবির বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান, ময়মনসিংহ’র পিডিবির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ, ডেসকোর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম, ডেসকোর সাবেক নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মো. জাকির হোসেন, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আকরাম উল্লাহ, পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন, আরইবির সদস্য প্রকৌশল মো. আব্দুর রহিম মল্লিক।

কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে মাত্র তিনজনকে। কিউ এম শফিকুল ইসলাম, মো. আমজাদ হোসেন এবং সৈয়দ আকরাম উল্লাহকে। আর এই তিনজনের নাম প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত তিনজনই অতীতে আওয়ামী লীগপন্থী ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ সদস্য ছিলেন। এমনকি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুর বলয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বিদ্যুৎ খাতের প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ডিপিডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি আবারও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে? তাহলে কি হাসিনার আর্শিবাদ পুষ্ট তিন প্রকৌশলীর মধ্যে ভাগ্য নির্ধারণ হবে।

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসির এইচআর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্তভাবে একজন বা দু’জনের নাম বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকেই অনুমোদনের মাধ্যমে নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া হবে।

কিউ এম শফিকুল ইসলাম: ‘সিন্ডিকেট রাজনীতির’ অভিযোগ। ডিপিডিসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) কিউ এম শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অতীতে ব্যাপক অনিয়ম, টেন্ডারবাজি, বদলি বাণিজ্য এবং মিটার কারসাজির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা।

সূত্র বলছে, পিজিসিবিতে দায়িত্ব পালনকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি ডিপিডিসিতে যোগ দেন এবং সেখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, তার সময় উচ্চচাপ সংযোগ এড়িয়ে নিম্নচাপ সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ক্ষতি, মিটার বাইপাস করে বিদ্যুৎ চুরি এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল ওপেন সিক্রেট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নবায়ন না হওয়ার পেছনেও এসব অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বিজ্ঞাপন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময় শফিকুল ইসলামের ছেলের রিসিপশন (বিয়ের বৌ-ভাত) অনুষ্ঠান করে গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে। সেই অনুষ্ঠানের ব্যয়-ভাড় নিয়েও প্রকৌশল সমাজে উঠেছে ব্যাপক সমালোচনার ঝড়। সে সময় তিনি ডিপিডিসি’র প্রতিটি ডিভিশনের প্রধানদের দাওয়াতে যেতে বাধ্য করেন। আর উপহার হিসেবে নির্ধারিত টার্গেট অনুযায়ী নগদ টাকা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ওই বিয়ে অনুষ্ঠানে ডিপিডিসির কালো তালিকাভুক্ত দালাল চক্রে সদস্যরাও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। বিয়েতে তারাও উপহার দিয়েছেন ১০ লাখ টাকা। তাই শফিকুল ইসলাম ডিপিডিসিতে দায়িত্বকালীন সময় লুটপাটের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন।

আমজাদ হোসেন: পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক মো. আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধেও রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, সিন্ডিকেট গঠন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে একটি বিশেষ বলয় তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন, সমন্বয় এবং আর্থিক প্রক্রিয়ায় তার একক আধিপত্য ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সৈয়দ আকরাম উল্লাহ: বিতর্কের মধ্যেই আরেক নিয়োগ দৌড়। বর্তমানে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আকরাম উল্লাহ। চলতি মাসেই তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ওই পদে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়েছে। তবে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের এমডি পদে পুনরায় আবেদন করলেও তাকে ভাইভা কার্ড দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারণ হিসেবে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রকল্পভিত্তিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে জানা গেছে। কিন্তু একই ব্যক্তি ডিপিডিসির এমডি পদে ভাইভার জন্য নির্বাচিত হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এক প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য বিবেচিত হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে কীভাবে তিনি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠলেন?

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ খাতের দুই জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী বলেন, লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অন্তত চারজন প্রার্থী ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কর্মকর্তা। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

একজন কর্মকর্তা বলেন,“বিদ্যুৎ খাতে এখনও একটি নির্দিষ্ট বলয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। যোগ্যতা নয়, বরং কে কোন গ্রুপের এটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

আরেকজন প্রকৌশলী বলেন,“যারা অতীতে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিতে ভালো ফল করেও রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ পাননি, এবারও তাদের একইভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।”

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি বিশ্লেষক রাজু আহমেদ শাহ বলেন,“ডিপিডিসির মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব শুধু প্রশাসনিক পদ নয়; এটি রাজধানীর বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখানে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।”

তিনি বলেন,“শুধু ভাইভা বোর্ড বা প্রশাসনিক সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দিলে জনআস্থা নষ্ট হবে। লিখিত পরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং স্বাধীন উপস্থাপনাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্যদের বাছাই করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা আয়োজন করা হলে রাজনৈতিক প্রভাব অনেকাংশে কমে আসবে।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপিডিসির মতো একটি কৌশলগত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে যদি বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো বিদ্যুৎ খাতের সুশাসন ও জনআস্থার ওপরও নেতিবাচক ছাপ ফেলে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াই পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসির এমডি নিয়োগ এখন আর কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD