আওয়ামী লীগ নেতা জ্যাকবকে খুশী করলেন পিডি তালহা

প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলায় আওয়ামী লীগ নেতা জ্যাকবের বাগানবাড়ির পাশে তার দেয়া জমিতে ভোলা হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরী কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্প।
বিজ্ঞাপন
ভোলা শহর থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দুরে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে হটিকালচার সেন্টার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। যদিও দরপত্র আহ্বানের পর হটিকালচার সেন্টার স্থাপনের তেমন কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। তবে জমিটি আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের নয় বলে দাবি করে প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর জানান, এটা স্থানীয় একটি স্কুলের জমি যা অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

সারাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীণ হর্টিকালচার উইংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে ৭৫ টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে। তবে দ্বীপ জেলা ভোলায় কোন হর্টিকালচার সেন্টার নেই। এর প্রেক্ষিতে ভোলায় একটি হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সাধারনত জেলা শহরের নিকটবর্তী উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন এলাকায় হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ভোলার ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম। ভোলার সবচেয়ে দুরবর্তী ও বঙ্গোপসাগরে তীরবর্তী উপজেলা চরফ্যাশন। সেই চরফ্যাশন উপজেলা শহর থেকেও প্রায় ২৫ কিলোমিটার দুরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবকে খুশি করার জন্য তার ব্যাক্তিগত জমিতে অধিগ্রহণের মাধ্যমে হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব করেন টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরী কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর।

অভিযোগ রয়েছে, হর্টিকালচার উইংয়ের মতামতের তোয়াক্কা না করে তিনি তার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এটা অনুমোদন করিয়ে নেন। বিগত সরকারের সময় এই প্রকল্পের তেমন দৃশ্যমান কোন কাজ না হলেও বর্তমান বিএনপি সরকার গঠনের পর এখানে ভবন তৈরীর জন্য প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। অথচ প্রস্তাবিত স্থানে হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন হলে তা ভোলাবাসীর কোন উপকারে আসবে না। ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর দৈনিক জনবাণীকে বলেন, জেলা শহর থেকে ১১৫ কিলোমিটার দুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হটিকালচার সেন্টার স্থাপন করছে এটা বাস্তবায়ন হলে এ জেলার কৃষকরা সুফল পাবে না। এটা নিয়ে মাসিক সমন্বয় সভায় আপত্তি তুলেছি।
বিজ্ঞাপন

টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্প ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২৮ সালের জুনে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর আওতায় ৭টি হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন করবে সরকার। এর মধ্যে ভোলার চরফ্যাশন ও কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরিসহ দুটি নতুন হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন করা হবে। ঢাকা, বান্দরবান, টাঙ্গাইলের বিদ্যমান তিনটি হর্টিকালচার সেন্টারে টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া মাদারীপুরে একটি টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি ও গোপালগঞ্জে একটি হর্টিকালচার সেন্টার আধুনিকায়ন করা হবে। তবে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুতের সময় সুকৌশলে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলাকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। ভোলার সাতটি উপজেলার মধ্যে বঙ্গোপসাগরের কূলবর্তী উপজেলা হলো চরফ্যাশন, ভোলার মধ্যবর্তী উপজেলা বোরহানউদ্দিনে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলার কৃষকরা উপকৃত হতেন বলে তারা মন্তব্য করেন। তবে কৃষক নাকি অন্য কোন গোষ্ঠীতে খুশি করতে এই মহা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিৎ।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কুশীলব হিসেবে খ্যাত ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদকে এই প্রকল্পের কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এই প্রকল্প কর্মকর্তা নিজেকে এখন বিএনপি পন্থী কর্মকর্তা হিসেবে প্রমান করার চেষ্টা করছেন। ২০১৮ সালের ৩০ বিসিএস কৃষি ক্যাডারের ফেইসবুক পেইজে দেয়া তার একটি পোষ্ট দৈনিক জনবাণীর হাতে এসেছে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পোষ্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
"মাহবুব-উল-আলম হানিফ মহোদয়ের সাথে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর অঞ্চলের কৃষি অফিসারদের সৌজন্য সাক্ষাত। আলোচনায় দেশের সামগ্রীক কৃষি উন্নয়নে ডিএইর ভুমিকা, পথভ্রষ্ট, কুচক্রী ও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টারত ডিএইর কিছু অসাধু অফিসারদের বিষয়েও কথা হয়। সরকারের সবচেয়ে সফল ডিপার্টমেন্ট কে দুর্নীতিগ্রস্থ নাম দিয়ে উপরন্তু সরকারকে বেকায়দা ফেলতে চাওয়ার নেপথ্যের কারিগরদের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তাদের অনেকেই বিএনপি জামাত সরকারের মদদপুষ্ট ও সুবিধাভোগী হওয়া সত্বেও এখন জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে সেই বিষয়টাও অবহিত করা হয়। তিনি দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেন এবং কেন্দ্রে বিষয়টা নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দেন মাঠ পর্যায়ে আমাদের যা যা করার করছি এখন দেখার বিষয় খামারবাড়ি ও কেন্দ্র কি ব্যবস্থা নেয়, আশাকরি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন স্যারেরা দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিবেন...হতাশ হওয়ার কিছু নাই, আলো আসবেই"
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর ৪ আগষ্ট শেখ হাসিনায় আস্থা জানিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে শান্তি মিছিলে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। তার কার্যক্রমের ভিডিও দৈনিক জনবাণীর হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায় তিনি ক্যামেরা হাতে আওয়ামী লীগের সাবেক কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বাহাউদ্দিন নাসিমদের সাথে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ভিডিও ধারণ করছেন। সূত্রের দাবি, শান্তি মিছিল আয়োজনের খরচের একটি বৃহৎ অংশ প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর বহন করেছেন।
২০১৬ সাল থেকে ইউটিউব চ্যানেল কৃষি বায়োস্কোপের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছেন প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর। তবে এই কৃষি বায়োস্কোপের মাধ্যমে কৃষকদের প্রতারিত করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর আমদানীকৃত অঅনুমোদিত জাতের চারা কলম প্রমোট করে কৃষকদের সর্বশান্ত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বেসরকারি টেলিভিশন যমুনা টিভি ২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল "বৃক্ষ তোমার নাম কি" শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে কোন এক অজানা কারণে কৃষকদের সরাসরি অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ভোলা সদর থেকে ১১৫ কিলোমিটার দূরে চরফ্যাশন উপজেলায় হটিকালচার সেন্টার তৈরিতে এ জেলার কৃষকরা কী উপকৃত হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরী কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জোবায়ের মাশরুর জনবাণীকে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ভোলার চরফ্যাশনে হটিকালচার সেন্টার স্থাপন হচ্ছে যার কাজ চলমান রয়েছে। হটিকালচার সেন্টারটি বাস্তবায়িত হলে এ জেলার কৃষকরা উপকৃত হবে পাশাপাশি এ দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় হটিকালচার সেন্টার তৈরি হওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরী কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন প্রকল্প শেষ পর্যায়ে হলেও প্রকল্পের বেশীরভাগ কাজই রয়েছে অসম্পূর্ণ। হর্টিকালচার সেন্টার বা হর্টিকালচার উইংয়ে কাজের কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও ডিএই'র সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদি মাসুদের কল্যানে তিনি পেয়েছেন হর্টিকালচার উইংয়ের বৃহৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের পদ। অভিযোগ রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের নামে টিস্যু কালচারের কোন অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যাক্তিদের নিয়োগ দিয়েছেন। যার ফলে এখন পর্যন্ত প্রকল্প থেকে তেমন কোন টিস্যু কালচারের চারা উৎপাদন হয়নি। পূর্বে অন্য প্রকল্প থেকে স্থাপিত টিস্যুকালচার ল্যাবের উৎপাদিত চারাকে তার প্রকল্পের হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চাটুকারিতার পুরস্কার হিসেবে ২০১৭ সালে ততকালীন আওয়ামী সরকার তাকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) কর্তৃক খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার সম্মাননা এবং ২০২১ সালে কৃষি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য জাতীয় স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন।
ভোলার বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী উপজেলায় হটিকালচার সেন্টার স্থাপন হলে কৃষক কী উপকৃত হবে এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম দৈনিক জনবাণীকে বলেন, ভোলার শেষ প্রান্তে বা বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী উপজেলায় হটিকালচার সেন্টার স্থাপন হলেও এতে করে যে কার্যকারিতা হবে না বিষয় টি এমন নয়। তবে জেলার মধ্যভাগে বোরহানউদ্দিন উপজেলায় হলে উত্তম হত।








