Logo

ডিপিডিসি’র পরিচালকের চেয়ারে বসছেন ফের ‘স্বৈরাচারের দোসর’

profile picture
বশির হোসেন খান
৭ জুন, ২০২৬, ১৯:২৩
ডিপিডিসি’র পরিচালকের চেয়ারে বসছেন ফের ‘স্বৈরাচারের দোসর’
ছবি: পত্রিকা থেকে নেওয়া।

রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশ) নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।

বিজ্ঞাপন

লিখিত পরীক্ষার পর ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনের জন্য নির্বাচিত তিন প্রার্থীর নাম প্রকাশের পর থেকেই বিদ্যুৎ খাতে শুরু হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও নেপথ্য লবিংয়ের অভিযোগ। সূত্র বলছে, শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্প সাবেক পরিচালক, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অকুলিন টেক বিডি লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের মাস্টার শেখ মো. জিয়াউল হাসান নির্বাহী পরিচালকের দৌড়ে এগিয়ে।

খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ যোগ্যতা, দক্ষতা কিংবা প্রশাসনিক সততার পরিবর্তে আবারও রাজনৈতিক বলয়, পুরোনো সিন্ডিকেট এবং স্বৈরাচারী আমলের প্রভাবশালী চক্র নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ডিপিডিসির মতো রাজধানীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি আবারও বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদের হাতেই যাচ্ছে? বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, লিখিত পরীক্ষার মূল্যায়ন এবং বাদ পড়া যোগ্য প্রার্থীদের বিষয় তদন্ত করে খতিয়ে দেখা হবে।

একই সঙ্গে বিতর্কিত প্রার্থী শেখ মো. জিয়াউল হাসানের অতীত কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা জোর দাবি জানান প্রকৌশলীরা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন বিদ্যুৎ খাতের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা। তবে ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, ভাইভা ও উপস্থাপনার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে মাত্র তিনজনকে ডিপিডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. জিয়াউল হাসান, প্রধান প্রকৌশলী শাহজাহান মিয়া, তত্ত্বাবধায়ক তরিকুল ইসলাম। তবে শেখ মো. জিয়াউল হাসান ও শাহজাহান মিয়া’র বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লীগপন্থী প্রকৌশলী বলয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং বিদ্যুৎ খাতের প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-কেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।

বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, লিখিত পরীক্ষায় বাছাইকৃত তিন প্রার্থীর মধ্যে দুই জনই দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগের আর্শিবাদপুষ্ট। সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. জিয়াউল হাসানকে স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্প পরিচালক থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, টাকা ও ক্ষমতা থাকলে যোগ্যতা লাগবে না। টাকা যেনো সব।

বিজ্ঞাপন

একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ খাত এখনও একটি গোষ্ঠীর দখলে। এখানে দক্ষতা নয়, বরং কে কোন বলয়ের লোক সেটাই নিয়োগের মূল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

সবচেয়ে বেশি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখ মো. জিয়াউল হাসান। স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, বদলি বাণিজ্য, মিটার কারসাজি সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।

জিয়াউল হাসান নাদিম, ১৯৯২-৯৩ সালে ছাত্রলীগ জাতীয় ইউনিয়নের যৌথ প্যানেল থেকে ইইউসিএসইউ-এর প্রচার সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। একই সময়ে জাহানারা ইমামের “ঘাতক দালাল নির্মূল” আন্দোলনে ছাত্রলীগ, জাসদ ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে বিএনপি ও জেসিডি -বিরোধী অবস্থানের বিষয়টিও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

এসব প্রেক্ষাপটের কারণে ডিপিডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক পদে তাঁর নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, জামায়াতপন্থী বা আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা এ নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন, আবার অন্যদের ধারণা অনুযায়ী বিইউইটি এর সাবেক জেসিডি ও এইবি সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির মধ্যে এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।

পাশাপাশি এএমআই প্রকল্পের অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবেও তাঁর নাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে, যেখানে পরামর্শদাতা -এর মাধ্যমে চুক্তি সম্মতি ও কাজের মান যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে এএমআই প্রকল্পের পরিচালক পদ থেকে অব্যাহিত হয়েছে। জিয়াউল হাসান নাদিমের নিয়োগ হলে, আওয়ামী লীগের সমর্থক, জামায়াতপন্থী গোষ্ঠী এবং জিটুজি প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা আরও প্রভাব ও শক্তি অর্জন করবে। ডিপিডিসি থাকবে স্বৈরাচারী প্রকৌশলীদেও কব্জায়।

এ ব্যাপারে জ্বালানি বিশ্লেষক রাজু আহমেদ শাহ বলেন,“ডিপিডিসির মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাজধানীর বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, গ্রিড ব্যবস্থাপনা এবং হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।” তিনি আরও বলেন,“শুধু ভাইভা বোর্ড বা প্রশাসনিক সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দিলে জনআস্থা ধ্বংস হবে। লিখিত পরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং স্বাধীন উপস্থাপনাভিত্তিক পদ্ধতিতে যোগ্যদের বাছাই করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর মতো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা আয়োজন করা উচিত।”

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. জিয়াউল হাসান বলেন, আমি বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা আমার মামা শশুর। আমার নিয়োগ কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমি পরিক্ষায় ফেল করলে নিয়োগ নিতে হবে। কারণ প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন আমার শ্যালক। সে থাকতে আমার চিন্তা নাই।

এবিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ নিলে সেটা সঠিক নিয়োগ হবে না।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD