ছয় ভবনের চারটিরই নেই রাজউকের অনুমোদন

রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলাকালে হাসপাতালটির অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভবন নির্মাণ অনুমোদন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। রাজউক জানিয়েছে, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়টি ভবনের মধ্যে চারটির কোন প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন নেই।
বিজ্ঞাপন
এছাড়াও নকশা অনুমোদন অনুযায়ী অগ্নি নিরাপত্তায় সেফটি এক্সিটসিড়ি নির্মাণ করেনি। অপরদিকে ফায়ার সার্ভিস জানায়, ৭০০ শয্যার এই বেসরকারি হাসপাতালটির অগ্নি নিরাপত্তা সনদ ২০২৩ সাল থেকে নবায়ন করা হয়নি এবং তাদের কোনো অনুমোদিত অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনাও নেই।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানায়, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কম্পাউন্ডের মধ্যে মোট ৬ টি ভবন রয়েছে যার মধ্যে ২টি ভবনের রাজউক অনুমোদন রয়েছে। অন্য ৪ টি ভবনের রাজউক অনুমোদিত নকশা নেই। আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিনের অনুকূলে ২০০৬ সালে বেজমেন্টসহ ৬ তলা হাসপাতাল ভবন এবং ২০০৯ সালে বেজমেন্টসহ ৮তলা মেডিকেল কলেজ ভবনের অনুমোদন দেয় রাজউক। তবে ভবন দুটির রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুসারে ভবনের অভ্যন্তরে কোর্টিয়ার্ড ও অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ির প্রস্তাবনা থাকলেও বিদ্যমান ভবনে কোর্টিয়ার্ড ও অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি নির্মাণ করেনি আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রাজউকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কম্পাউন্ডের মধ্যে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছে আরও ৪টি ভবন। এ ভবন গুলোর মধ্যে রয়েছে, ১০ তলা ও ৮ তলা বিশিষ্ট দুটি হাসপাতাল ভবন এবং ৩ তলা এবং ৫ তলা বিশিষ্ট দুটি মসজিদ ভবন। তবে এর মধ্যে রাজউক অনুমোদিত নকশা অনুসারে ভবনে কোন রেষ্টুরেন্ট বা কনফেকশনারীর প্রস্তাবনা নেই। সম্প্রতি হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং একাধিক তদন্ত শুরু হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক ধারণা, প্রসব-পরবর্তী অস্ত্রোপচার কক্ষে কোনো কারিগরি ত্রুটি এ মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রশাসন শাখায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান সিকদার জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা সাড়া দেয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিন মাসের মধ্যে ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তবে নির্ধারিত সময়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি। নোটিশে বলা হয়েছিল, ফায়ার প্রিভেনশন অ্যান্ড এক্সটিংগুইশিং অ্যাক্ট, ২০০৩ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী হাসপাতাল পরিচালনার আগে অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা মানেননি।
হাসপাতাল সূত্রে জানায়, নিহত ছয় নবজাতকের মধ্যে দুইজনকে প্রসব-পরবর্তী অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে মৃত অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আনা হয়। বাকি চারজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। যদিও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এবং কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী কক্ষের ব্যবস্থাপনা ও বায়ু চলাচল ব্যবস্থার ঘাটতি এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি রমনা থানা পুলিশও পৃথক তদন্ত শুরু করেছে। এক নবজাতকের বাবার দায়ের করা মামলার পর এই তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও আলাদা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেয়াজুল ইসলাম জনবাণী কে বলেন, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অনুমোদনহিন ভবনগুলোর মধ্যে ধর্মীয় স্থাপনা থাকায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় চরম অবহেলার কারণে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তদন্তে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর এরই মধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলসহ কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এ সিদ্ধান্তকে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না।’
তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজের বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে এই নোটিশ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
অপরদিকে গতকাল শনিবার রাজধানীর হলিডে ইন হোটেলে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নোটিশকে ‘বেআইনি’ উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।








