Logo

জনস্বাস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলীর পদের দাম পাঁচ কোটি

profile picture
বশির হোসেন খান
২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৪৯
জনস্বাস্থ্যের প্রধান প্রকৌশলীর পদের দাম পাঁচ কোটি
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আউয়াল। ফাইল ছবি

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদ প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা ভেঙে আব্দুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বসাতে পাঁচ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে এমন গুরুতর অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে পদটি বাগিয়ে নেওয়ার ফলে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা অন্তত তিনজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে পাশ কাটানো হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রীতি ও জ্যেষ্ঠতার কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। গত বছরের ১৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ আব্দুল আউয়ালকে ডিপিএইচইর প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু তার নিয়োগের পর থেকেই অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে শুরু হয় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার স্বাভাবিক মাপকাঠিকে পাশ কাটিয়ে একটি বিশেষ প্রভাববলয়ের আশীর্বাদেই তিনি রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হকের দিকেও। সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিববের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় প্রশাসনিক বলয়ে ছামিউল হকের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলেন, এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আব্দুল আউয়ালের নিয়োগের পথ সুগম করা হয়। এমনকি পাঁচ কোটি টাকার লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ছামিউল হকের নাম সামনে এসেছে। তাদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে ময়মনসিংহকেন্দ্রিক কর্মকর্তাদের প্রভাব বিস্তার করায় ডিপিএইচইতে একটি শক্তিশালী ‘ময়মনসিংহ সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে।

ডিপিএইচইর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, প্রধান প্রকৌশলী পদে সাধারণত জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আব্দুল আউয়ালের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কর্মকর্তাদের প্রশ্ন জ্যেষ্ঠতার তালিকায় পেছনে থাকা একজন কর্মকর্তা কীভাবে এক লাফে অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পদে বসলেন। আব্দুল আউয়ালের পেশাগত দক্ষতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলেন, কর্মজীবনে তিনি ডিপিএইচইর প্রধান কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেননি এবং বড় কোনো প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও তার উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা নেই। বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, প্রধান প্রকৌশলীর পদে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি থাকলে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে জটিলতা তৈরি হতে পারে। প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগও উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তার দাবি, সামান্য কারণেই শোকজ, চাকরি হারানোর ভয় দেখানো, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটূক্তি এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে অপদস্থ করার মতো ঘটনা ঘটছে। কেউ তাকে দেখে দাঁড়িয়ে সম্মান না দেখালেও তাকে ব্যক্তিগতভাবে ডেকে নিয়ে কৈফিয়ত তলব করা হয়, এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে ডিপিএইচইতে বর্তমানে ‘ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।

ময়মনসিংহের মেকানিক সানাউল্লাহকে ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে ঝালকাঠিতে বদলি করার অভিযোগও রয়েছে। অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, প্রশাসনিক প্রয়োজনের বদলে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ যদি বদলির ভিত্তি হয়, তাহলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার দুটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে সিলেট ও ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে ফাইল আটকে রেখে ঘুষ গ্রহণ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে আব্দুল আউয়ালের নিয়োগ, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে মাঠে নেমেছে বলে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পাঁচ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদ দখলের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

এ বিষয়ে দুর্নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জান্নাতুর রহমান বলেন, অভিযোগ সত্য হলে এটি কেবল একজন কর্মকর্তার অনিয়মের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক নৈতিকতার ওপর গুরুতর আঘাতের শামিল।

বিজ্ঞাপন

ডিপিএইচইর মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যদি অর্থ, প্রভাব ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যই পদায়নের নিয়ামক হয়ে ওঠে, তাহলে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার মূল্য কোথায় এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD