Logo

মজুত থাকলেও কৃষকের হাতে কেন পৌঁছাচ্ছে না সার?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ আগস্ট, ২০২৬, ২০:৪১
মজুত থাকলেও কৃষকের হাতে কেন পৌঁছাচ্ছে না সার?
ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পাওয়ার অভিযোগে ডিলারের গুদামে ঢুকে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের সার সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। রবিবার (২৩ আগস্ট) সকালে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনায় কৃষি বিভাগের হিসাবে ২০২ বস্তা ইউরিয়া ও ২৩ বস্তা পটাশ সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সময়ে এমন ঘটনা মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও কৃষকেরা প্রয়োজনের সময়ে সার পাচ্ছেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি সার মজুত রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, কিছু ডিলার ও ব্যবসায়ী পরিকল্পিতভাবে সংকটের পরিবেশ তৈরি করছেন। তবে বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সরবরাহব্যবস্থায় বাস্তব সমস্যার চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে।

জয়পুরহাট, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও শেরপুরের কৃষকদের অনেকে জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী সার পেতে তাদের ডিলার ও বিক্রয়কেন্দ্রে একাধিকবার যেতে হচ্ছে। কোথাও সার না থাকার কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশ বা ফোনের পর সার পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কৃষকেরা।

বিজ্ঞাপন

কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার কিনতে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। সে হিসাবে ৫০ কেজির একটি বস্তায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ পড়ছে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক মাসুম মিয়া বলেন, কয়েকটি দোকানে ঘুরেও সার পাননি তিনি। কখনো দোকান বন্ধ, কখনো সার নেই, আবার কখনো বরাদ্দ না থাকার কথা বলা হয়েছে। দিনের পর দিন ডিলারের কাছে ঘুরতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের গণিপুর গ্রামের কৃষক ফরিদ উদ্দিনের অভিযোগ, এক বস্তা ইউরিয়া সরকারি মূল্যের চেয়ে ২০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ১ হাজার ৩৫০ টাকার ইউরিয়ার জন্য ১ হাজার ৫৫০ টাকা চাওয়া হয়েছে। এর আগে ডিএপি সারও বাড়তি দামে কিনেছেন বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

নওগাঁর বদলগাছীর কৃষক মজিদুল ইসলাম জানান, কয়েকদিন ডিলারের কাছে ঘুরেও সার না পেয়ে পরে স্থানীয় এক প্রতিনিধির মাধ্যমে ফোন করে সার সংগ্রহ করতে হয়েছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন, বাজারে সার না পেয়ে বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৪০ টাকা দরে কিনেছেন। প্রয়োজনের সময়ে সার দিতে না পারলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বেশি দামেও কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সরকারের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত সার

বিজ্ঞাপন

কৃষি মন্ত্রণালয় মাঠপর্যায়ের অস্থিরতাকে পরিকল্পিত অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সার নিয়ে মাঠে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, এটা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’

তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার দেশে বেশি সার মজুত রয়েছে। এমনকি অনেক সরকারি গুদামে সার রাখার জায়গাও নেই বলে দাবি করেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ নতুন নীতিমালায় ডিলারশিপ হারানোর আশঙ্কা থেকে বরাদ্দের সার উত্তোলন না করে সংকটের কথা ছড়াচ্ছে। কেউ কেউ বরাদ্দ পাওয়া সার খুচরা বিক্রেতা বা অন্য প্রতিনিধির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি কিছু অসাধু ডিলার সিন্ডিকেট করে বাড়তি দামে সার বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন ডিলার নীতিমালা ঘিরে অস্থিরতা

সম্প্রতি বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ জারি করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করা পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ এখনো সক্রিয়। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে—এমন গুজবও বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, যেসব খুচরা বিক্রেতার লাইসেন্সে সমস্যা রয়েছে কিংবা অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়ম মেনে ব্যবসা করা খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই।

এদিকে চা বাগানে এবার আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা থেকে সার দেওয়া হচ্ছে। আবার সংকটের আশঙ্কায় কিছু কৃষক আগাম আলু চাষের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার কিনে মজুত করছেন বলেও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

ডিলারদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র

বিজ্ঞাপন

তবে ডিলারদের সংগঠনগুলোর বক্তব্য সরকারের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ও সরবরাহ কম থাকায় মাঠপর্যায়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম মন্ডল বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুলও সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম বলে জানিয়েছেন।

তাদের মতে, আমনসহ উৎপাদন মৌসুমে নতুন ডিলার নীতিমালা বাস্তবায়নের সময় এবং একই সঙ্গে অপ্রতুল বরাদ্দ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি হিসাবে মজুত কত?

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রধান চার ধরনের সারের প্রারম্ভিক মজুত ছিল সন্তোষজনক। এর মধ্যে ইউরিয়া ৬ লাখ ১৪ হাজার টন, টিএসপি ৪ লাখ ৯ হাজার টন, ডিএপি ৪ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং এমওপি ২ লাখ ৮৪ হাজার টন।

চলতি আমন মৌসুমের জন্যও সরকার সার বরাদ্দ করেছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়ার বরাদ্দ ২ লাখ ২৬ হাজার টনসহ মোট প্রায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার টন সার বরাদ্দ দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে দেশে উৎপাদনকারী কয়েকটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা মজুত এবং পরবর্তী বোরো মৌসুমের প্রয়োজন মেটাতে বিদেশ থেকে সার আমদানির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারি পর্যায়ে আরও ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।

কেনার তালিকায় রয়েছে ৭০ হাজার টন ইউরিয়া, ১ লাখ ১৫ হাজার টন এমওপি, ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি এবং ৬০ হাজার টন টিএসপি। সোমবার (২৪ আগস্ট) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব সার কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খানের ভাষ্য, সার নিয়ে মূল সমস্যা তৈরি করছে পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ। তার দাবি, দেশে যে পরিমাণ সার রয়েছে এবং যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে সংকট হওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, ‘ডিলারদের মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে, এগুলো আমরা কঠোর মনিটরিং শুরু করেছি।’

সার সরবরাহ পরিস্থিতি নজরদারিতে ৬৪ জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মাঠপর্যায়ে মনিটরিং আরও জোরদার করার জন্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে।

ফলে সরকারি মজুতের হিসাব একদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহের কথা বললেও কৃষকের বাড়তি দাম, ডিলারের কাছে ঘোরাঘুরি এবং গুদামে ঢুকে সার নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। আমন মৌসুমে এই ব্যবধান কতটা সরবরাহ সংকট, কতটা বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা আর কতটা কৃত্রিম অস্থিরতা—তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কার্যকারিতার ওপর।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD