Logo

এমডি’র অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত অগ্রণী ব্যাংক

profile picture
মো. রুবেল হোসেন
২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২০
এমডি’র অব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত অগ্রণী ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এর ১৫ (গ) (৩) এ রয়েছে, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তি একই সময়ে ব্যাংক-কোম্পানীর কোন চুক্তি বা লেনদেনে সংযুক্ত হইতে বা ব্যাংক-কোম্পানীর প্রতিনিধিত্ব করিতে পারিবে না।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম এই আইন লঙ্ঘন করে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক ইখতিয়ার উদ্দিন কে অগ্রণী ব্যাংকের কুমিল্লা সার্কেল ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মহাব্যবস্থাপক মো. ফজলুল করিম কে রাজশাহী সার্কেলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন।

এসব দুরবিসহ সিদ্ধান্তের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় একের পর এক ঘটছে অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট চুরি ও আর্থিক অনিয়মের মত ঘটনা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তদারকি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলামের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত ধারাবাহিকভাবে ঘটছে এসব অর্থ আত্মসাতের ঘটনা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আর্থিক অনিয়মের অনেকগুলো ঘটনা ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলামের সময়ে সংঘটিত হওয়ায় ব্যাংক পরিচালনায় তার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা। নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখা, পাবনার কাশিনাথপুর শাখা, চাঁদপুরের ছেংগারচর বাজার শাখা, ঢাকার সেন্ট্রাল ল’ কলেজ শাখা, বগুড়ার ভাটারা শাখা, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি ও আক্কেলপুর শাখা, ঢাকা নারিশা বাজার ও আন্তাবাহ্রা শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শাখায় সংঘটিত হয়েছে সবচেয়ে বড় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। রংপুর সার্কেল প্রধান মহাব্যবস্থাপক স্বপন কুমার ধর ও সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আলিমুল আল রাজি (তমাল) সিএনডি লেজারে মোট ১৩২ কোটি ২৬ লাখ টাকা (ডেবিট ও ক্রেডিট উভয়) ভুয়া লেনদেন সৃষ্টি করে। এর মধ্যে তিনি গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ৩০ কোটি টাকা, ২৮ ডিসেম্বর ৭ কোটি টাকা সিএনডি লেজারে ভুক্তি দেন। এছাড়াও ৬ ডিসেম্বর ইস্যুকৃত প্রায় ৬ টাকার একটি আইবিডিএ চেক কালেকশন না করে ড্রয়ারে ফেলে রাখেন। এর ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা হিসাব বহির্ভূত স্থিতি সৃষ্টি হয়। এই অর্থ সমন্বয় করা সম্ভব না হওয়ায় পুরো টাকাই আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এর বাহিরে অনান্য ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় ২৪ কোটি টাকাসহ আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির দ্বিতীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর শাখায়। শাখার ভল্ট থেকে প্রায় ১১ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অগ্রণী ব্যাংক কাশিনাথপুর শাখার প্রিন্সিপ্যাল অফিসার আবু জাফর, ব্যবস্থাপক হারুন বিন সালাম ও ক্যাশিয়ার সুব্রত চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, অগ্রণী ব্যাংক রাজশাহী বিভাগীয় ও পাবনা আঞ্চলিক শাখা থেকে ৫ কর্মকর্তা আকস্মিক অডিটে যান কাশিনাথপুর শাখায়। অডিটে শাখায় ১০ কোটি ১৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৭৮ টাকা আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। অডিট কর্মকর্তা বিষয়টি সাঁথিয়া থানায় জানালে পুলিশ অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। এরপর চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অগ্রণী ব্যাংকের ছেংগারচর বাজার শাখার ভল্ট থেকে ৭৫ লাখের বেশি টাকা নিয়ে ব্যাংকটির ক্যাশ কর্মকর্তা দীপঙ্কর ঘোষ উধাও হয়ে যান। এ ঘটনায় মতলব উত্তর থানায় একটি মামলা করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ মিয়া। অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্যোগে ৪ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।

এছাড়াও সেন্ট্রাল ল’ কলেজ শাখায় ক্লিয়ারিং সাসপেন্স হিসাব থেকে কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা, বগুড়ার ভাটারা শাখার কয়েক কোটি টাকার নগদ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি ও আক্কেলপুর শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, নারিশা বাজার শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা, আন্তাবারাহা শাখায় সঞ্চয়পত্রের অর্থ আত্মসাৎ, কলাকোপা শাখা ও পাবনার সুজানগর শাখায় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এ সকল অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংক শুধু তদন্ত কমিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন কখনো আলোর মুখ দেখেনা, এমনকি কোন কর্মকর্তা শাস্তির আওতায় আসে না। এছাড়াও অগ্রণী ব্যাংকে স্টাফদের গাড়ি ও গৃহ লোন নিতেও হেনস্তার শিকার হতে হয়। উৎকোচ ছাড়া ব্যাংকে কর্মরত কোন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এ লোন নিতে পারে না। অসমর্থিত একটি সূত্র জানায়, উৎকোচ ছাড়া কোন ফাইল নড়ে না, পদে পদে হতে হয় লাঞ্ছনা ও ভোগান্তির শিকার। এছাড়াও অগ্রণী ব্যাংকে বদলি বাণিজ্যের ঘটনাও ঘটছে।

অগ্রণী ব্যাংক দেশের ২০০টিরও বেশি শাখায় ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে ব্র্যাক নেট লিমিটেডের সাথে তথ্য প্রযুক্তি সেবা চুক্তি সম্পাদন করেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে, কারণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাছের বখতিয়ার আহমেদের ভাই সৈয়দ পি এফ আহমেদ ব্র্যাক নেটের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও)। এছাড়াও ব্র্যাক নেট ও এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সমস্যাগ্রস্ত। নিজের ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি কর্মকর্তাদের। আত্মীয় করনের মাধ্যমে ব্র্যাক নেট কে তালিকাভুক্তি করার অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

ব্যাংকটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) থাকা অবস্থায় মো. আনোয়ারুল ইসলাম কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত থেকেছেন। তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের উচ্চপদস্থ সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে অবৈধ ঋণ বরাদ্দ, সন্দেহজনক পোস্টিং এবং অন্যান্য দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘন করে কর্পোরেট গ্যারান্টির ভিত্তিতে বড় ঋণ প্রদান এবং অসাধু গ্রাহকদের জাল বন্ধকের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অদক্ষতা, অনিয়ম এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপী ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। চলতি বছরে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকসমূহের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি । অগ্রণী ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ৮০০.৮৪ কোটি এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩২১.৩৩ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার অগ্রণী ব্যাংক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি এক সভায় অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করে খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।

এ-সব প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম সাথে একের অধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক খোন্দকার লুৎফুল কবীর দৈনিক জনবাণী কে বলেন, এমডি স্যার মিডিয়ার (গণমাধ্যম) সাথে কথা বলবেন না। আপনার বিষয়টি জানিয়েছি, তিনি অন্য সময় আপনার সাথে কথা বলবেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD