Logo

কারাগারে জন্ম, চার দেয়ালের ভেতরেই বেড়ে উঠছে শত শত শিশু

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৫৮
কারাগারে জন্ম, চার দেয়ালের ভেতরেই বেড়ে উঠছে শত শত শিশু
ছবি: সংগৃহীত

কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরেই জন্ম, শৈশব ও বেড়ে ওঠা—বাংলাদেশের কিছু শিশুর জীবনের বাস্তবতা এমনই। মা বন্দী থাকায় তাদেরও থাকতে হচ্ছে কারাগারে। কেউ কারাগারেই জন্ম নিয়েছে, কেউ আবার মায়ের সঙ্গে বাইরে থেকে কারাগারে এসেছে। বাইরের স্বাভাবিক পরিবেশ, স্কুল, খেলার মাঠ ও সামাজিক জীবনের বদলে তাদের শৈশব কাটছে বন্দী মায়ের সঙ্গে সীমাবদ্ধ পরিসরে।

বিজ্ঞাপন

গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে এমনই কয়েকজন শিশুর দেখা মিলেছে। সেখানে একটি শ্রেণিকক্ষে চার শিশুকে পড়াশোনা করতে দেখা যায়। তাদের একজন গুনগুন করে গান ও ছড়া শোনাচ্ছিল। অথচ যে বয়সে শিশুদের মুক্ত পরিবেশে খেলাধুলা ও বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই তাদের জীবন আটকে আছে কারাগারের উঁচু দেয়ালের ভেতরে।

কারাগারে জন্ম নেওয়া শিশুর গল্প

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক শিশুর জন্মের গল্প আরও করুণ। তার মা হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। কারাগারে আসার সময় তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে কারাগারের বাইরে অবস্থানকালে হঠাৎ প্রসববেদনা শুরু হলে সেখানেই ঘাসের ওপর শিশুটির জন্ম হয়।

বিজ্ঞাপন

কারারক্ষীরা শিশুটির নাম রাখেন ঘাসের সঙ্গে মিলিয়ে। মায়ের সঙ্গে কারাগারে থেকেই তার বেড়ে ওঠা। শিশুটি বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে। কারাগারে তাকে স্কুলের টিফিন হিসেবে বিস্কুট দেওয়া হয় এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়।

তবে শিশুটির বয়স ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের পর তাকে কারাগারের বাইরে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। কিন্তু মেয়েটিকে বাইরে রাখার মতো আত্মীয়স্বজন না থাকায় মায়ের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।

কাশিমপুর কারাগারে শতাধিক শিশু

বিজ্ঞাপন

কারা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪৮ জন নারী বন্দীর সঙ্গে ৫২টি শিশু রয়েছে। কোনো কোনো মায়ের সঙ্গে একাধিক সন্তানও আছে। এদের অনেকের জন্ম কারাগারের ভেতরেই হয়েছে।

১৪ জুলাই ওই কারাগারে নারী বন্দীর সংখ্যা ছিল ৭০১ জন। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জন হত্যা মামলায় এবং ১৬৯ জন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন ছিলেন। ৩০ জন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।

কারাগারের ভেতরে মা ও শিশুর বসবাসের এই বাস্তবতা শুধু কাশিমপুরে সীমাবদ্ধ নয়। ১৬ জুলাই কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে মোট বন্দী ছিলেন ৯১ হাজার ৮৭৯ জন। তাঁদের মধ্যে নারী ৩ হাজার ৪৮৭ জন। নারী বন্দীদের মধ্যে ১ হাজার ১২০ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং ২ হাজার ৩৫০ জন হাজতি।

বিজ্ঞাপন

মা বন্দীদের সঙ্গে থাকা শিশুর সংখ্যা ছিল ৩০৬। এর মধ্যে ছেলে শিশু ১৬০ এবং মেয়ে শিশু ১৪৬ জন। পরে ২৬ জুলাই এই সংখ্যা বেড়ে ৩১২ জনে দাঁড়ায়। মা বন্দীর সংখ্যা ছিল ২৯১ জন। কোনো কোনো মায়ের একাধিক সন্তান কারাগারে থাকায় শিশু ও মায়ের সংখ্যায় এই পার্থক্য দেখা যায়।

ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি বন্দী

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দীদের থাকার জায়গার সংকটও প্রকট। কারাগারটির ধারণক্ষমতা ২১২ জন হলেও ১৪ জুলাই সেখানে ছিলেন ৭০১ নারী বন্দী।

বিজ্ঞাপন

কারাবিধি অনুযায়ী বন্দীর ঘুমানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকার কথা থাকলেও অতিরিক্ত বন্দীর কারণে বাস্তবে সেই সুযোগ সীমিত। অনেককে মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে থাকতে হয়। মা ও শিশুদের জন্যও আলাদা পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই।

এক মা জানান, দুই মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে তাকেও মেঝেতে ঘুমাতে হয়। যদিও কারারক্ষীদের ভাষ্য, শিশু রয়েছে এমন মায়েদের তুলনামূলক কিছুটা বেশি জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

চার দেয়ালের মধ্যেই শিশুশিক্ষা

বিজ্ঞাপন

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে মা বন্দীদের শিশুদের জন্য একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে ছোট একটি মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার ও শিশুদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও মাঠের কিছু খেলনা ও রাইডের অবস্থা জরাজীর্ণ।

শ্রেণিকক্ষে তিন বছর বয়স থেকে শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া শুরু হয়। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। পাশাপাশি আরবি শিক্ষা, গান, নাচ ও ছবি আঁকার ব্যবস্থাও রয়েছে।

কারারক্ষী ও শিক্ষক আমেনা আক্তার জানান, অন্য কারাগার থেকে আসা একটি শিশু পাঁচ বছর বয়সেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায়নি। দিবাযত্ন কেন্দ্রে আসার পর তাকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ পড়া ও লেখা শেখানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শিশুদের পড়াশোনায় কখনো কখনো বন্দী নারীরাও সহযোগিতা করেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চশিক্ষিত। এমন একজন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে আছেন এবং দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুদের পড়াশোনায় সহায়তা করেন।

মায়ের সঙ্গে কারাগারে শিশুদের জীবন

এক বন্দী মা জানান, তিনি প্রায় ২১ মাস ধরে সন্তানসহ কারাগারে আছেন। তাঁর সন্তানের বয়স তিন বছর। শিশুটি দিবাযত্ন কেন্দ্রে পড়াশোনা করে। কারাগার থেকে সকালে তাকে রুটি, চিনি, দুধ ও কলা দেওয়া হয়। দুপুরে দেওয়া হয় ভাত, ডাল ও মাছ। সপ্তাহে দুই দিন মাংসও দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্য এক মা জানান, সন্তান প্রসবের পর শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক, গামছা ও ডায়াপারসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করা হয়।

আরেক বন্দী নারী জানান, একটি হত্যা মামলায় তিনি, তাঁর স্বামী ও ননদ কারাগারে আছেন। সন্তানের বয়স দুই বছরের বেশি। আদালতে হাজিরার সময় শিশুটির বাবার সঙ্গে দেখা হয়।

কারাগারে থাকা মায়েদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে সন্তান নিয়ে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এতে সন্তানদের শৈশব যেমন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তেমনি মায়েদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

ছয় বছর পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে থাকার সুযোগ

কারা মহাপরিদর্শকের তথ্য অনুযায়ী, কারাবিধি অনুসারে শিশু ছয় বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকতে পারে। ছয় বছর পূর্ণ হলে এবং বাইরে শিশুটিকে দেখাশোনার মতো কেউ না থাকলে মায়ের সম্মতি নিয়ে তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু পরিবারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

কারা মহাপরিদর্শক আরও জানিয়েছেন, যেসব কারাগারে শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। বন্দীদের মধ্যে শিক্ষিত কেউ কেউ শিশুদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন। আবার যেসব কারাগারে মাত্র একজন বা দুজন শিশু থাকে, সেখানে আলাদা দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় কারা কর্তৃপক্ষ নিজেদের ব্যবস্থাপনায় শিশুদের দেখভাল করে।

বিজ্ঞাপন

সব কারাগারে নেই দিবাযত্ন কেন্দ্র

দেশে মোট ৭৪টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি কারাগারে মা বন্দীদের শিশুদের জন্য মোট ২৬টি দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ অনেক কারাগারে শিশুদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশের আলাদা ব্যবস্থা নেই।

২০১৫ সালের ২৯ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যেসব কারাগারে মা বন্দীদের সঙ্গে ১০ জনের বেশি শিশু রয়েছে এবং শিশুদের বয়স সাত-আট বছরের নিচে, সেসব কারাগারে দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

বেসরকারি সংস্থা অপরাজেয় বাংলাদেশ ২০১২ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মা বন্দীদের সঙ্গে থাকা শিশুদের জন্য প্রথম শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু মনে করেন, সাজাপ্রাপ্ত মায়েদের বড় একটি অংশ দরিদ্র পরিবারের। শিশুদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে দিলে তারা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই কারাগারে থাকা শিশুদের জন্য পেশাদার শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা জরুরি।

কারাগারের পরিবেশে শিশুর মানসিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, সমাজ ও স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে বেড়ে উঠলে শিশুর স্বাভাবিক সামাজিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের মতে, মায়ের কাছ থেকে শিশুকে বিচ্ছিন্ন করারও সুযোগ নেই। তবে কারাগারে থাকা অবস্থায় শিশুর শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও সামাজিকীকরণ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, যেসব কারাগারে মা বন্দী রয়েছেন, সেখানে অবশ্যই দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকা উচিত। শিশুদের শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা, ছবি আঁকা, ছড়া-কবিতা ও নীতিকথা শেখানোর পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও নিশ্চিত করা দরকার।

আদালতের হস্তক্ষেপও হয়েছে

কারাগারে শিশুদের জীবন ও অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আদালতের হস্তক্ষেপ হয়েছে। ২০২৩ সালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মায়ের সঙ্গে কনডেমড সেলে একটি শিশুর বসবাসের বিষয়টি সামনে এলে শিশুটির পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়।

পরে হাইকোর্ট কারাগারে থাকা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বিধি, নীতিমালা বা প্রবিধান তৈরির বিষয়ে রুল জারি করেন।

এ ছাড়া চলতি বছর বিভিন্ন কারাগারে মা বন্দীদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সংখ্যা, বয়স ও তাদের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে হাইকোর্ট।

কারাগারে থাকা এসব শিশুর অপরাধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মায়ের বন্দিত্বের কারণে তাদের শৈশবও বন্দী হয়ে পড়ছে। তাই নিরাপদ পরিবেশে মায়ের সান্নিধ্য বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা ও মানসিক বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD