চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন দিয়ে ডম-ইনো এমডির প্রতারণা

নিজের একটি ফ্ল্যাট মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এটি শুধু চার দেয়ালের স্বপ্ন নয়, সারাজীবনের সঞ্চয় ও নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয়েছে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। শহরের ব্যস্ত এলাকায় চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপন। বিশাল আবাসিক প্রকল্প, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনার সহজ সুযোগ সব মিলিয়ে আকর্ষণীয় অফার।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে স্বপ্নের ফ্ল্যাট। রাজধানীর উপকণ্ঠে একসময় ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জমি। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই এলাকাই হয়ে ওঠে আবাসন ব্যবসার নতুন কেন্দ্র। একের পর এক বিশাল বিলবোর্ডে ভেসে ওঠে স্বপ্নের ছবি লেকের পাশে আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট, প্রশস্ত রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
বিজ্ঞাপনে বলা হয় “আজ বুকিং, আগামীকাল আপনার স্বপ্নের ঠিকানা।” হাজার হাজার মানুষ সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন। কেউ চাকরিজীবনের শেষ সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন। কেউ প্রবাসে থাকা সন্তানের পাঠানো টাকা জমিয়েছিলেন। কেউ আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বুকিং করেছিলেন কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাট। কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা গেল, বিজ্ঞাপনের সেই ঝকঝকে শহর বাস্তবে যেন এক ভিন্ন গল্প। নির্মাণকাজ থমকে আছে। কোথাও শুধু কয়েকটি পিলার দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও আবার প্রকল্পের সাইনবোর্ড ছাড়া কিছুই নেই। আর ক্রেতাদের হাতে পড়ে আছে চুক্তিপত্র, রসিদ এবং অপেক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস। এই অভিযোগের তীর এখন আবাসন খাতের মাফিয়া রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালাম লিটনের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের(দুদক) সেশুনবাগিচার প্রধান কার্যলয়ে একটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন ভুক্তভুগিরা।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেখ হাসিনা-রেহানার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই বিতর্কিত ব্যবসায়ী। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ছত্রচ্ছায়ায় রাজনৈতিক বিবেচনায় গড়ে তোলেন ডম-ইনো লিমিটেড নামের রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। গত ১৫ বছরে আবাসন খাতে একক আধিপত্যে বিস্তার করেছেন তিনি। ‘সব কাজের কাজি’ এই দাপুটে ব্যবসায়ী।
অভিযোগ বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যান। এর পর থেকে এই স্বৈরাচারের দোসর ডম-ইনো’র এমডি আব্দুস সালাম লিটন আত্মগোপনে চলে যান। তার বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতি ও প্রতারনার মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করলে জেল হাজতে প্রেরন করা হয়। বেশ কয়েকদিন জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আবারও গ্রাহকদের প্রতারনার ফাঁদে ফেলেছেন এই প্রতারক আব্দুস সালাম লিটন।
তিনি জানা অজুহাতে নির্মাণকাজ কিছুটা পিছিয়েছে। এরপর আসে নতুন অজুহাত অনুমোদন, জমি, ব্যাংক ঋণ, বাজার পরিস্থিতি কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। একসময় ক্রেতারা বুঝতে পারেন, তাদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার হিসাব থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাটের দেখা মিলছে না।
বিজ্ঞাপন
ডম-ইনো’র এর প্রভাবশালী কর্ণধার আব্দুস সালাম লিটন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি আবাসন ব্যবসাকে এমন এক জালে পরিণত করেছেন, যেখানে এক প্রকল্পের টাকা দিয়ে আরেক প্রকল্পের কাজ চালানো হয়। ক্রেতারা প্রশ্ন তুললেও অফিসের দরজা খুলছে না, ফোন ধরছেন না কর্মকর্তারা এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
আয়শা বেগম নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, “ছেলের পড়াশোনা আর মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা টাকা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম অন্তত মাথা গোঁজার একটা জায়গা হবে। এখন টাকা নেই, ফ্ল্যাটও নেই।”
আরেকজন ভুক্তভুগি মশিউর রহমান বলেন, “চুক্তির সময় আমাদের সামনে ভবিষ্যতের ছবি দেখানো হয়েছিল। এখন সেই ভবিষ্যৎ কোথায়, কেউ বলতে পারছে না।”
বিজ্ঞাপন
কয়েকজন ক্রেতা নথিপত্র যাচাই করে দেখেছেন অধিকাংশ জমিতেই ঝামেলা রয়েছে। কোনো প্রকার জমির মালিকদের সঙ্গে সমাধান না করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ডম-ইনো’র সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি শুরু করেছেন। জমির মালিকরা জিজ্ঞেস করলে তাদের সঙ্গে নানা বাহানা ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করে যাচ্ছেন। এর সব ঘটনা নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি আগে দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সভাপতি প্রকৌশলী সাবেক সংসদ আব্দুস সবুরের দাপট। আর এখন বিএনপির এক প্রতিমন্ত্রীর দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন। ভয়ে গ্রাহকরা এখন দিশেহারা।
এ ব্যাপারে আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞ জান্নাতুর রহমান বলেন, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রকল্প অনুমোদন, জমির বৈধতা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা যাচাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয় ডম-ইনো’র কর্ণধার আব্দুস সালাম লিটন এর পক্ষে ম্যানেজার ফারুক বলেন, আমরা নিয়ম মেনে কাজ করি। তবুও যদি আপনি বাড়াবাড়ি করেন আপনার করুন পরিনতি করে দিবো।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া আরেক একজন নিজেকে ডম-ইনো’র কর্ণধার আব্দুস সালাম লিটনের লোক পরিচয় মানিক নামেক একজন এই প্রতিবেদককে নানা ভাবে হুমকি ধামকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিউজ বন্ধ কর, না হলে তোকে জেলে পচে মরতে হবে।
তৃতীয় পর্ব : ডম-ইনো এমডির গ্রাহকের টাকায় আলিশান জীবন








