Logo

ডম-ইনো এমডি’র প্রতারণায় ৫ হাজার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

profile picture
বশির হোসেন খান
৯ আগস্ট, ২০২৬, ২১:৩৯
ডম-ইনো এমডি’র প্রতারণায় ৫ হাজার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ
ডম-ইনো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালাম লিটন।

একটি ফ্ল্যাটের স্বপ্ন, যে স্বপ্ন পূরণে কেউ বিক্রি করেছেন পৈতৃক জমি, কেউ নিয়েছেন ব্যাংকঋণ, আবার কেউ জীবনের সমগ্র সঞ্চয় তুলে দিয়েছেন ডম-ইনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের হাতে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি বছরের পর বছর অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং অসমাপ্ত ভবনের কংক্রিটের স্তূপে আটকে যায়, তখন তা শুধু একটি ব্যবসায়িক বিরোধ থাকে না; হয়ে ওঠে পাঁচ হাজার পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রতিচ্ছবি।

বিজ্ঞাপন

এমনই একাধিক অভিযোগ ঘিরে আলোচনায় এসেছে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালাম লিটনের নাম। বিভিন্ন প্রকল্পের ফ্ল্যাট ক্রেতা ও জমির মালিকদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর না করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব, চুক্তির শর্ত নিয়ে বিরোধ এবং একাধিক আইনি জটিলতার কারণে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার। এসব অভিযোগের কয়েকটি ইতিমধ্যে আদালতের বিচারাধীন।

নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়া, পরিবার নিয়ে নতুন ঠিকানায় বসবাসের প্রত্যাশা থাকে তাদের। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে সেই স্বপ্নই পরিণত হয় অনিশ্চয়তায়।

রাজধানীর আবাসন খাতের পরিচিত প্রতিষ্ঠান ডম-ইনো লিমিটেডকে ঘিরে এমনই অভিযোগ তুলেছেন ফ্ল্যাট ক্রেতা ও জমির মালিক। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ পরিশোধের পরও অনেকে নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে পাননি। আবার যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমি দেওয়া কিছু মালিকও প্রতিশ্রুতি সুবিধা পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে না এগোনোয় তারা আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। অনেক ক্রেতা দাবি করেছেন, আবাসনের জন্য বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। কারণ একজন ক্রেতা সাধারণত দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, ঋণ বা পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনা করে একটি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, চুক্তির শর্ত পূরণে সমস্যা বা যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হলে এর প্রভাব পড়ে ক্রেতার জীবনে। ডম-ইনো রিয়েল এস্টেটকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ফ্ল্যাট হস্তান্তরে জটিলতা এবং চুক্তি অনুযায়ী সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ। এসব বিষয়ে কিছু অভিযোগ আইনি প্রক্রিয়ায়ও গড়িয়েছে।

সূত্র বলছে, রাজধানীর নয়াপল্টনে বহুতল ভবন নির্মাণের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ডম-ইনোর বিরুদ্ধে। নির্মাণকাজ চলমান অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে আগাম অর্থ সংগ্রহ করে এবং ভবনের প্রকৃত ফ্ল্যাট সংখ্যার চেয়েও বেশি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে জমির মালিকরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত আদেশ দেন, জমির মালিকদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ডম-ইনো কোনো ফ্ল্যাট বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন মিরপুর-১০-এর সি-ব্লকের ২১ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির জমির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও। প্রায় এক যুগ আগে শুরু হওয়া সাততলা ভবনের নির্মাণকাজ আজও শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির কারণে জমির মালিক নিজ উদ্যোগে ভবনের দ্বিতীয় তলায় গ্লাস স্থাপন করে সেখানে নিজের মালামাল সংরক্ষণ করছেন।

ডম-ইনোর বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে শান্তিনগরের ২০ নম্বর প্রকল্পকে ঘিরে। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া ১৯ তলা ভবনের নির্মাণকাজ ১৮ বছরেও শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা একপর্যায়ে ডম-ইনোকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের উদ্যোগে নির্মাণকাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। তদন্তে জানা গেছে, রাজউকের অনুমোদন ছিল ১৯ তলা ভবনের জন্য। তবে অনুমোদন ছাড়াই ভবনটি ২৫ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় ডম-ইনো। এ উদ্দেশ্যে পুরোনো পিলারের সঙ্গে নতুন পিলার সংযুক্ত করে কাঠামো পরিবর্তনের কাজ শুরু করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা ও কাগজপত্রে কারসাজি করে ভবনকে ২৫ তলার দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনুমোদনবিহীন ১৯ তলার ওপরে থাকা ১৬টি ফ্ল্যাটও বিক্রি করা হয়েছে, ফলে এসব ফ্ল্যাটের ক্রেতারা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ১৩৬ জন ফ্ল্যাট ক্রেতা ডম-ইনোর প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও নিরাপত্তাকর্মীদের প্রকল্প থেকে বের করে দেন। এরপর তারা নিজেদের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে নির্মাণকাজ শেষ করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। প্লটটি এখনো ডম-ইনোর নামে নিবন্ধিত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের ভিত্তিতে স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। পরে ফ্ল্যাট মালিকরা নতুন সংযোগ বা পুরোনো সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর কাছে আবেদন করলেও তা নাকচ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুহিবুল্লাহ বলেন, প্লট-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং ডম-ইনোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা মিটারে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া কিংবা নতুন সংযোগ প্রদান সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারিত ফ্ল্যাট ক্রেতারা এখন নিজ উদ্যোগে ভবনের নির্মাণকাজ চালিয়ে গেলেও মৌলিক সেবার অভাবে নতুন করে ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ডম-ইনোর সাবেক কর্মকর্তা বলেন, এমডি স্যার নিজেই একজন প্রতারক। তিনি গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতারনা করেছেন। তার অধিকাংশ প্রকল্প ঠিক ভাবে হস্তন্তর করেনি। তিনি আওয়ামী লীগের সরকারের ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষের ওপর নির্যাতন করেছেন। তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

এ ব্যাপারে আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞ জান্নাতুর রহমান বলেন, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রকল্প অনুমোদন, জমির বৈধতা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা যাচাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় পর্ব : ফ্ল্যাট বিক্রির নামে ডম-ইনো এমডির গ্রাহকের ৫’শ কোটি টাকা আত্মসাৎ

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD