এনায়েতপুর থানা হামলার দুই বছর, স্মৃতিতে এখনও বিভীষিকা

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় সংঘটিত ভয়াবহ হামলার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দিনের আতঙ্ক, আগুন, আর্তনাদ ও প্রাণহানির স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বেঁচে ফেরা পুলিশ সদস্যদের। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫ জন পুলিশ সদস্য। এছাড়া নিহত হন তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি।
বিজ্ঞাপন
সময়ের সঙ্গে থানার পোড়া দেয়াল নতুন রঙে রাঙানো হলেও সেই দিনের বিভীষিকা এখনও মানুষের মনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
সেদিন থানার ভেতরে আটকে পড়া নারী পুলিশ সদস্য রেহানা পারভীন জানান, হামলার সময় ভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলে তিনি আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে দ্বিতীয় তলায় আটকা পড়ে যান। বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় একসময় মনে হয়েছিল আর জীবিত বের হওয়া সম্ভব হবে না। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।
তিনি বলেন, আটকে পড়াদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী সদস্য।
বিজ্ঞাপন
ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রাজ্জাক, সাতজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং সাতজন কনস্টেবল। এছাড়া সংঘর্ষে নিহত হন স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী শিহাব হোসেন, তাঁতশ্রমিক ইয়াহিয়া আলী এবং মাদ্রাসাছাত্র সিয়াম হোসেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল থেকেই থানা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের গুলির ঘটনার পর স্থানীয়রা থানা ঘেরাও করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন বলে দাবি করা হয়।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের একটি অংশের অভিযোগ, মানুষ সরে যেতে শুরু করলে থানার দিক থেকে আবার গুলি ছোড়া হয়। এতে শিহাব নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কিছু সময় পর কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী আবার থানা ঘিরে ফেলে। এরপর থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ভেতরে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য স্থানীয় বাসিন্দা বাবলু মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন। তিনি জানান, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন। তাদের সাধারণ পোশাক পরিয়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয়। কয়েকজনের পরিবারকেও তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন।

বাবলু মিয়া বলেন, ঘরের ভেতরে বসে বাইরে থাকা পুলিশ সদস্যদের প্রাণভিক্ষা চাইতে শুনেছেন। তারা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তার স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম জানান, হামলাকারীরা তাদের বাড়িতেও তল্লাশি চালিয়েছিল। ঘরে নারী ও শিশুদের উপস্থিতি দেখে তারা ফিরে যায়। তিনি বলেন, সেই ঘটনার মানসিক প্রভাব এখনও পরিবারের ছোট শিশুদের মধ্যে রয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে তারা ঘুমের মধ্যে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে।
থানার পাশের ব্যবসায়ী স্বপ্ন মোল্লা জানান, হাজারো মানুষ থানার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে ফিরে এসে জানতে পারেন, পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি কয়েকজন সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছেন।
তার ছোট ভাই রাকিবুর রহমান জানান, প্রথমে একটি মিছিল থানার সামনে আসে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলেও কিছু সময়ের মধ্যে আবার কয়েক হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হয়। বিকেলে এলাকায় ফিরে তিনি বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। তার দাবি, হামলাকারীদের অনেকের মুখ কাপড়ে ঢাকা ছিল এবং তাদের হাতে লাঠি ছিল।
বিজ্ঞাপন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানার পাশের এক বাসিন্দা জানান, হামলার সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়ির বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাদের বের করে এনে মারধর করা হয় এবং ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় থানায় মোট ৫৯ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন নারী কনস্টেবল। হামলার পর থানা থেকে ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এনায়েতপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ছয়টি অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার ২২ দিন পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ অজ্ঞাত ৫ থেকে ৬ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরে এ ঘটনায় আরও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে সাবেক সংসদ সদস্যসহ কয়েকশ মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব মামলার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু জানান, তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিরাজগঞ্জ জেলার সাবেক সমন্বয়ক হযরত আলী উসমান দাবি করেন, পুলিশের গুলিতে একজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষোভে থানায় হামলা চালায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ঘটনার জেরেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এনায়েতপুর থানার সেই দিনের ঘটনাকে ঘিরে এখনও রয়েছে নানা প্রশ্ন, স্মৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের মতে, ভবনের দেয়াল সংস্কার করা গেলেও ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের ভয়াবহতা তাদের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি।








