Logo

বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০:৩০
বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?
ছবি: সংগৃহীত

বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের পর দেশে গ্রাহকদের মধ্যে বিল নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। শহর কিংবা গ্রাম—প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকেই আগের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন। বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই বিলের সঙ্গে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য ফি যুক্ত হওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। ব্যবহার করা বিদ্যুতের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত হারে বিল পরিশোধ করতে হয়। নতুন দরে ৪০০ ইউনিটের পর প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা। ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহার করলে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের জন্য দিতে হয় ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ৫ শতাংশ ভ্যাট।

বিলের কাগজে ব্যবহৃত ইউনিটের হিসাবের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ যোগ হয়। মিটার কেনা না থাকলে থাকে মিটার ভাড়াও। আগের মাসের বকেয়া থাকলে সেটির সঙ্গে বিলম্ব মাশুলও যুক্ত হয়।

ফলে বিদ্যুৎ বিলের মূল দামের বাইরে ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বিলম্ব মাশুল এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়া দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। পোস্টপেইড বিলে এসব আলাদাভাবে উল্লেখ থাকে। আর প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের সময়ই নির্দিষ্ট চার্জ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা হয়।

বিজ্ঞাপন

ডিমান্ড চার্জ নিয়ে আপত্তি

বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয় অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ প্রস্তুত রাখার খরচ হিসেবে। মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় মেটাতে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত হিসাবে আবাসিক গ্রাহকের প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। ফলে দুই কিলোওয়াট লোডের গ্রাহককে মাসে ৮৪ টাকা এবং ১০ কিলোওয়াট লোডের গ্রাহককে ৪২০ টাকা ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লোড অনুমোদন করানো হলে বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করলেও সেই বাড়তি লোডের জন্য প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।

বিজ্ঞাপন

একজন গ্রাহক জানান, কারিগরি বিষয়টি না বোঝায় তিনি ১৫ ওয়াট লোডের সংযোগ নিয়েছেন। এখন প্রতি মাসে শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬৩০ টাকা দিতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে থ্রি-ফেজ মিটারের ভাড়া যুক্ত হলে আরও ২৫০ টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ ১৫ ওয়াট লোডের ক্ষেত্রে মিটার ভাড়াসহ মাসে অতিরিক্ত ৮৮০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হতে পারে।

কীভাবে নেওয়া হয় মিটার ভাড়া

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ বিল আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব আদায় সহজ করতে দেশে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। নতুন সংযোগ এবং পুরোনো মিটার নষ্ট হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রিপেইড মিটার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাবে একটি সিঙ্গেল-ফেজ প্রিপেইড মিটারের মূল্য ৬ হাজার টাকা। ১০ বছর বা ১২০ মাসের আয়ুষ্কাল ধরে এর ভাড়া মাসে ৪০ টাকা করে নেওয়া হয়। থ্রি-ফেজ মিটারের মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা এবং এর মাসিক ভাড়া ২৫০ টাকা। ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে বিনা খরচে নতুন মিটার দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের পর মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং এনার্জি বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আগেই কেটে নেওয়া হয়। ফলে গ্রাহক রিচার্জ করা পুরো অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারে ব্যয় করতে পারেন না। এ নিয়েও অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার এক গ্রাহক প্রশ্ন তুলেছেন, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ কোন ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং কতদিন পর্যন্ত দিতে হবে—তা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

ফরাজিকান্দা গ্রামের এক নারী গ্রাহক বলেন, "কারেন্ট পাই না। টাকা খালি বাড়ে আর বাড়ে দিনে দিনে। যদি মিটারে এরকম চাপটা পড়ে তাহলে গরিবের জন্য সমস্যা না। ৫০০ টাকা ভরলে দেড়শ করে কাইট্যা নিতাছে। সাড়ে তিনশ টাকা টিকে।"

প্রিপেইড মিটার নিয়ে আন্দোলন

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাগুলোর দাবি, প্রিপেইড মিটার চালু হলে বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে। তবে নতুন করে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ অনেক এলাকায় বাধার মুখে পড়েছে।

অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া, বিল বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কায় বিভিন্ন জেলায় প্রিপেইড মিটারবিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে গণ-অনশন, সভা-সমাবেশের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ফোরামও গঠন করা হয়েছে।

ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, গ্রাহকরা অগ্রিম টাকা দিতে রাজি নন। তার মতে, এ বিষয়ে গণশুনানির মাধ্যমে জনগণকে বিষয়টি বোঝানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, "নানা জটিলতার কারণে আমরা এটা গ্রহণ করতে চাচ্ছি না। এই ব্যাপারে আমরা জাতীয় পর্যায়ে ৩০টা জেলার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। এসব জেলায় আন্দোলন চলছে এবং গ্রাহক অধিকার রক্ষা জাতীয় কমিটি করা হয়েছে।"

নারায়ণগঞ্জে প্রিপেইড মিটার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞদের যে প্রশ্ন

বিজ্ঞাপন

ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া আদায় নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা রয়েছে।

তিনি বলেন, "মিটার একটা উন্নততর প্রযুক্তি এটাকে গ্রাহকের সুযোগ হিসেবে নেওয়ার কথা এবং এটাকে মানুষ সেবা হিসেবে মনে করছে না। যেটাকে দুর্ভোগ হিসেবে মনে করছে। বাড়তি পয়সা আদায়ের অযুহাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা বিইআরসি বিচারিক পর্যায়ে নিষ্পত্তি করা দরকার।"

তার ভাষ্য, "মিটার ভাড়া বিতরণ চার্জের সঙ্গে সমন্বয় হতে হবে। মিটার আলাদাভাবে ভাড়া আদায় করার কোনো সুযোগ নাই। জনগণের কাছ থেকে ডিমান্ড চার্জের নামে বাড়তি অর্থ আদায় এটা একধরনের লুটপাটে পরিণত হয়েছে। ডিমান্ড চার্জের রিভিউ হওয়া দরকার।"

বিজ্ঞাপন

ড. শামসুল আলম আরও বলেন, যেহেতু ডিমান্ড অনুযায়ী সবসময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না, তাই ডিমান্ড চার্জের নৈতিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিতরণ সংস্থাগুলোকে এই চার্জের বিপরীতে প্রকৃত খরচের হিসাব স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, "যদি ধরেন আরইবির এক টাকা ৪৩ পয়সা যদি তার বিতরণ চার্জ হয় তাহলে তার বিতরণ ট্যারিফ হয়ে গেল। তাহলে বাইরে যেটা নেওয়া হলো, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জের জন্য তার কী খরচ হচ্ছে। যে চার্জ নিচ্ছে কী কারণে, কী খরচ হচ্ছে এটার এটার বৈধতা নিয়ে, ন্যায্যতা নিয়ে এটার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরে আবার ডিমান্ড অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে না।"

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, "ডিমান্ড চার্জ চব্বিশ ঘণ্টার হিসেবে সারামাস জুড়ে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য পুরো মাসের জন্য দিচ্ছি। অথচ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি কম। এখন গ্রাহক যদি বলে কেন ভাই, আমাকে বিদ্যুৎ দিচ্ছ কম তাহলে ডিমান্ড চার্জ এত নিবা কেন- সেটা তাহলে একট অনাস্থা তৈরি করে, অস্বস্তি-ক্ষোভ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে প্রবলেমটা হচ্ছে।"

তার মতে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। মানুষের আস্থার ঘাটতির কারণ স্পষ্ট করা এবং গ্রাহকদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা দরকার।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, "গ্রাহকদের যে ক্ষোভ হচ্ছে এগুলো আসলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো বডিকে দিয়ে অডিট করা, চেক করা, ভেরিফাই করা এই কাজগুলো করানো হলে গ্রাহকদের আস্থা অনেকখানি ফিরবে। আর পয়লা কথা হচ্ছে বিদ্যুৎটা আপনাকে দিতে হবে,"

যা বলছে বিতরণ সংস্থা

বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ৮০ শতাংশকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনগণকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। তার দাবি, পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইডে গেলে বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে। প্রিপেইড মিটারে বাড়তি কোনো অর্থ কাটা হয় না; পোস্টপেইডের মতোই ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়।

তিনি জানান, গ্রাহক এককালীন মিটার কিনে না দিলে ভাড়া নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলে ০.৫ শতাংশ হারে রিবেট বা ছাড় পান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিটার ভাড়া ও বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।

তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময়ও এই চার্জ বাড়ানো হয়নি। তাদের ভাষ্য, সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে কোনো সমস্যা পায়নি। তবে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নির্ধারণ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD