Logo

ফায়ার সার্ভিসে ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হেলাল-আরমান

profile picture
বশির হোসেন খান
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২:৩০
ফায়ার সার্ভিসে ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হেলাল-আরমান
ফায়ার সার্ভিসে ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হেলাল-আরমান

আগুন নেভাতে গিয়ে মানুষের জীবন বাঁচান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। অথচ সেই ফায়ার ফাইটারদের নিরাপত্তার জন্য কেনা সরঞ্জামই যদি নিম্নমানের হয়, তাহলে আগুনের মুখে দাঁড়ানো মানুষগুলোর জীবন কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্রয় ও স্টোর শাখা ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খান। তাঁর সঙ্গে সিন্ডিকেট করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে উপসহকারী পরিচালক শামস আরমানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র, ক্রয়, গুদাম ব্যবস্থাপনা, বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী বলয় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এর ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শামস আরমান ও হেলাল উদ্দিন ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে এমনভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছেন যেন বদলি, নিয়োগ এবং টেন্ডার—সবই হয় এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। আর এই কাজে শামস আরমানের প্রধান হাতিয়ার সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও গুদাম) মো. হেলাল উদ্দিন। আরমান-হেলাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাঁদের সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে আছে, তা চিন্তার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

‘হেলাল সিন্ডিকেটের’ পুরোনো শিকড়?

হেলাল উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ, টেন্ডার ও ক্রয়-গুদাম ঘিরে বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। আওয়ামী সরকারের আমলে ২০২৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত উপ-সহকারি পরিচালক পদ থেকে সহকারি পরিচালক প্রশাসন ও অর্থ পদটি বাগিয়ে নেন হেলাল। আওয়ামী সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে বদলি বান্যিজের অভিযোগ উঠলে তাকে সহকারি পিরিচালক হিসাবে বদলি করা হয়। বরিশালে গিয়েও থেমে থাকেনি হেলালের কালো হাত। সেখানে গিয়েও পরিদর্শকদের কাছ থেকে লাইসেন্স প্রতি ‘মাসোহারা’ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হেলালের বিরুদ্ধে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা লেঃ কর্নেল অবঃ জাহাঙ্গীর আলমের আত্মীয়ের সাথে লবিষ্ট করে ডিজির স্টাফ অফিসার শামস আরমান এর মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যে আবারও ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরে আসেন হেলাল। ১৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও গুদাম) পদে আসিন হন হেলাল উদ্দিন।

জীবন বাঁচানোর সরঞ্জামেই ‘ঝুঁকি’

বিজ্ঞাপন

ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের জন্য কেনা তাপ-প্রতিরোধী বুট, সুরক্ষা গ্লাভস, মাস্ক, চোখের সুরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিম্নমানের হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। আগুনের তীব্র তাপ, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করেন ফায়ার ফাইটাররা। ফলে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহকারীকে সুবিধা দিতে ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হয় এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি করা হয়। এসব অভিযোগের পক্ষে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, সরবরাহ ও পণ্যের মান-সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে।

গুদামে দায়িত্বের বাইরে কারা?

গুরুত্বপূর্ণ অংশ গুদাম ব্যবস্থাপনা নিয়ে। স্টোরকিপার বাহাউদ্দিনকে যথাযথভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে ডিজির স্টাফ অফিসার শামস আরমান নিজের প্রভাববলয়ের লোকজনের মাধ্যমে গুদাম পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেন। ফলে সরকারি মালামালের সংরক্ষণ, সরবরাহ ও হিসাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখানেই সামনে আসে ‘আরমান-হেলাল সিন্ডিকেট’ নামটি।

বিজ্ঞাপন

মাসে ৭-৮ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ

ক্রয় ও গুদাম শাখা থেকে প্রতি মাসে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা শামস আরমানকে দেওয়া হয়। তাঁকে খুশি রাখতে নিয়মিত উপহার ও বাজারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে সদরঘাটের বাসায় ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগের আরও গুরুতর অংশ হলো—এই অর্থ শুধু ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয় না; বরং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট রাখাসহ বিভিন্ন কাজে সিন্ডিকেটের অর্থ ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ক্রয়-গুদামের আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন, সরবরাহকারীদের হিসাব, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কল ও যোগাযোগের তথ্য তদন্ত করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

বদলি ময়মনসিংহে, কিন্তু দায়িত্ব ঢাকায়!

শামস আরমানকে নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। আরমান ময়মনসিংহে উপ-সহকারি হিসাবে বদলি হলেও সেপদটি শূন্য রেখে ডিজির স্টাফ অফিসার পদেই বসে আছেন। শামস আরমান ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে এমন ভাবে অধিপত্য বিস্তার করেছেন যেন বদলি নিয়োগ এবং টেন্ডার সব তিনি একাই করেন তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

টেন্ডারের আগেই ‘কাজের মালিক’ নির্ধারণ?

বিজ্ঞাপন

ক্রয় ও স্টোর শাখা নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সমঝোতা, কমিশন এবং পছন্দের সরবরাহকারীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। বিভিন্ন ক্রয়ে কমিশনের বিনিময়ে সরবরাহকারী নির্বাচন এবং পণ্য গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়। ক্রয় ও গুদাম শাখা ঘিরে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পোশাক ও বুট কেনাকাটায় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

প্রশ্ন উঠছে, এত অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন?

ফায়ার সার্ভিস এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে মানুষের জীবন। সেখানে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম, নিম্নমানের পণ্য গ্রহণ, সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু আর্থিক দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি ফায়ার ফাইটারদের নিরাপত্তা এবং জননিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

বিজ্ঞাপন

হেলাল উদ্দিন খান ও শামস আরমানকে ঘিরে নথি ও প্রমাণ থাকার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সিন্ডিকেটটি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করতে পারে। ক্রয়-সংক্রান্ত সব নথি, দরপত্রের কাগজপত্র, সরবরাহকারীর তালিকা, পণ্যের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, গুদাম রেজিস্টার, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বের আদেশ পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই সম্ভব।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD