Logo

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার শিশু, এখনো খোঁজ নেই ২ হাজারের

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:৩০
সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার শিশু, এখনো খোঁজ নেই ২ হাজারের
প্রতীকী ছবি

স্কুল থেকে ফেরার পর মসজিদের সামনে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিল সাত বছরের সকাল। আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার অপেক্ষায় পরিবার। ঢাকার সাভারে কার্টুন দেখতে দেখতে বাসার বাইরে বেরিয়ে আর ফেরেনি পাঁচ বছরের যাদব। আবার পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে ঘর ছাড়ার ১১ দিন পর নিজেই ফিরে এসেছে ১৪ বছরের মাহি।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাগুলো ভিন্ন হলেও শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার বাস্তবতা একই প্রশ্ন সামনে আনছে—কেন শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে এবং নিখোঁজ হওয়ার পর কতজনই বা পরিবারের কাছে ফিরছে?

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা নিজেরাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরেছে, সেই তথ্য না থাকায় পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

বিজ্ঞাপন

কোন বয়সে কত শিশু নিখোঁজ

পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ ৬৮ জন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরেছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ১ হাজার ৯৭০ জনের।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, অনলাইন জিডি ব্যবস্থা চালুর পর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে ১৬ হাজার ৪১৪ হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ৫৫০টিতে দাঁড়ায়।

ছোটদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ

পুলিশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারাতে পারে। অনেকে নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় একা বাড়ি ফিরতে পারে না। আবার একা বাইরে বের হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

বিজ্ঞাপন

১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে কারণগুলো কিছুটা ভিন্ন। অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকার মতো বিষয়গুলোকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

আট বছরেও ফেরেনি সকাল

২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগের খান মোহাম্মদ মসজিদ এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ইসমাইল হাসানের ছেলে সকাল। তখন তার বয়স ছিল সাত বছর।

বিজ্ঞাপন

সকালের বাবা ইসমাইল হাসান জানান, স্কুল থেকে ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বিকেলে মসজিদের সামনে খেলতে যায় সকাল। পরে অন্য শিশুদের কাছ থেকে জানতে পারেন, লাল জ্যাকেট পরা এক ব্যক্তি ভিডিও গেম খেলার কথা বলে তাকে নিয়ে গেছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দুজনকে রিকশায় করে সকালকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে তাদের মুখ স্পষ্ট ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি, মাইকিং এবং পুলিশের কাছে যাওয়ার পরও ছেলের সন্ধান পাননি তিনি।

পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরেও কোনো হদিস মেলেনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

সন্তানের সন্ধানে নিজের সঞ্চয় ও স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছেন বলে জানান ইসমাইল। তাঁর দাবি, এভাবে প্রায় ২৭ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এখন মানুষের সহযোগিতায় সংসার চলছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

কার্টুন দেখতে গিয়ে নিখোঁজ যাদব

গত ৩০ জুলাই সাভার এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের যাদব কর্মকার। তার মা অর্চনা রানী দাস পোশাকশ্রমিক। প্রতিদিনের মতো তিনি কাজে যাওয়ার সময় ছেলেকে দাদুর কাছে রেখে যান।

অর্চনার ভাষ্য, যাদব দাদুর কাছে দোকানে যাওয়ার কথা বলেছিল। বৃষ্টি কমলে দোকানে যাওয়ার কথা বলে দাদু তাকে ঘুমাতে বলেন। পরে যাদব কার্টুন দেখতে চাইলে টেলিভিশন চালু করে দিয়ে দাদুও ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান, যাদব ঘরে নেই।

বিজ্ঞাপন

এরপর এলাকায় মাইকিং ও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। অর্চনা অভিযোগ করেন, প্রথম দিন থানায় গেলে ২৪ ঘণ্টা না হলে জিডি নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছিল। পরদিন জিডি করা হলেও এখন পর্যন্ত ছেলের সন্ধান মেলেনি।

যাদবের পরিবার কোনো মুক্তিপণ চেয়ে ফোনও পায়নি।

১১ দিন পর নিজেই ফিরল মাহি

বিজ্ঞাপন

গত ৩০ আগস্ট ময়মনসিংহের আকুয়া পূর্ব নয়াপাড়া থেকে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহি। পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে ১৪ বছরের এই কিশোরী বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মায়ের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে দুই ভাইয়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর মাহি ৫০ টাকা নিয়ে বের হয়েছিল। পরে রাতের ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার কমলাপুরে পৌঁছায়। সেখানে বিভিন্ন হোটেলে কাজ নেয়। রাতে কাজ করে দিনের বেলায় ঘুমিয়ে সময় কাটাতে থাকে।

এভাবে ১১ দিন পার হওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর নিজেই বাড়িতে ফোন করে নিজের অবস্থান জানায় মাহি। পরে তাকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

জিডি নিয়েও পরিবারের অভিযোগ

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় থানায় গিয়ে জিডি করতে গিয়ে হয়রানি বা দেরির অভিযোগও করেছেন কয়েকটি পরিবার।

৩০ আগস্ট বনানীর সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে চার বছরের মেয়েকে হারিয়ে ফেলেন বিথী। তাঁর ভাষ্য, জুতা কেনার সময় মেয়ের হাত ছেড়ে দেওয়ার পর আর তাকে খুঁজে পাননি।

বিথী জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে ২৪ ঘণ্টা না হলে জিডি নেওয়া হবে না বলে তাঁকে বলা হয়। পরদিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থানায় গেলেও নানা কারণে জিডি করতে দেরি হয়। শেষ পর্যন্ত নিখোঁজের দুই দিন পর জিডির কপি হাতে পান তিনি।

মহিলা পরিষদের উদ্বেগ

শিশু নিখোঁজ ও গুমের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ৭ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিশুরা খেলতে গিয়ে, স্কুল থেকে ফেরার পথে, প্রলোভনের শিকার হয়ে কিংবা অপরিচিত স্থানে পথ হারিয়ে নিখোঁজ হচ্ছে।

সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশুরা পাচার চক্রের কবলে পড়ছে কি না বা অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

আরও পড়ুন

এ ঘটনায় সরকারকে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। নোটিশে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার, কেন্দ্রীয় মিসিং চিলড্রেন ডেটাবেজ বা পোর্টাল তৈরি এবং কার্যকর মিসিং চাইল্ড অ্যালার্ট সিস্টেম চালুর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

‘অপহরণের চেয়ে নিখোঁজ বেশি’

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলেন, অপহরণের তুলনায় নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা বেশি। তাঁর দাবি, অনেক পরিবার সন্তান নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানায় না বা থানায় জিডি করে না।

তিনি জানান, এমএসএফের পর্যবেক্ষণে জয়পুরহাটে শিশু অপহরণের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তবে স্থানীয় অনেক পরিবার এ বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক বলেও জানান তিনি।

কিশোরদের ক্ষেত্রে মানসিক ও পারিবারিক চাপ

শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, স্কুলে বুলিং, পারিবারিক অশান্তি, বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহের মতো বিষয় কিশোর-কিশোরীদের ওপর আবেগীয় প্রভাব ফেলতে পারে।

তাঁর মতে, এসব পরিস্থিতিতে কেউ কেউ রাগ বা আবেগের বশে বাসা ছেড়ে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাইরের জগতের ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায় কিশোর-কিশোরীরা সহজেই প্রলোভন বা অপহরণের শিকার হতে পারে।

অভিভাবকদের সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত রাগ বা চুপচাপ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি রাগের সময় সন্তানকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলা বা এ ধরনের কথা না বলার পরামর্শও দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা যে একই কারণে ঘটছে না, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেই তার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। কোথাও অপহরণের অভিযোগ, কোথাও পথ হারানো, আবার কোথাও অভিমান করে ঘর ছাড়ার ঘটনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুত জিডি, অনুসন্ধান ও পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় শিশুর সন্ধান পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD