দারিদ্র্য কমাতে ৫৭৩ কোটি টাকার সত্তরের মডেল

গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে দারিদ্র্য কমাতে প্রায় ৫৭৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯৭০ সালের ‘সেমাউল মডেল’ এবং ষাটের দশকে বৃহত্তর কুমিল্লায় চালু হওয়া ‘কুমিল্লা মডেল’-এর সমন্বয়ে প্রস্তাবিত এই প্রকল্প প্রথমে কুমিল্লা, ফেনী ও বগুড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
‘সেমাউল প্লাস অ্যান্ড পোভার্টি প্রোগ্রাম’ (এসপিইপিপি) নামের কারিগরি সহায়তা প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে আট বছর ছয় মাস। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) যৌথভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে। প্রস্তাবিত ব্যয় ৫৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি নির্ধারিত এলাকায় সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রামীণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতা বাড়াতে ‘সেমাউল’ মডেল চালু হয়েছিল। এর মূল দর্শন ছিল কঠোর পরিশ্রম, স্বাবলম্বন ও পারস্পরিক সহযোগিতা।
অন্যদিকে, ষাটের দশকে বৃহত্তর কুমিল্লায় গড়ে ওঠা ‘কুমিল্লা মডেল’-এ সমবায়, সঞ্চয়, তদারকির মাধ্যমে ঋণ প্রদান, স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা এবং কৃষি সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
নতুন প্রকল্পে এই দুই মডেলের কার্যকর উপাদান একত্র করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি সহায়তা বা প্রশিক্ষণ পাবেন। পাশাপাশি প্রায় ২২ হাজার ৮০০ পরিবারকে বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ অনুদান হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আসবে। বাকি অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।
বিজ্ঞাপন
পুরোনো মডেল নিয়ে প্রশ্ন
তবে পাঁচ দশক আগের কোরিয়ান ও কুমিল্লা মডেল একত্র করে বর্তমান সময়ে দারিদ্র্যবিমোচনের কৌশল তৈরি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, কয়েক দশক আগে গ্রামগুলো যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন ছিল। এখন বাজার, প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। তাই বর্তমান গ্রামীণ অর্থনীতির চাহিদা বিবেচনায় কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তবে প্রকল্প প্রস্তাবকারী সংস্থা বার্ডের বক্তব্য ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, কুমিল্লা কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার সেমাউল মডেল হুবহু অনুসরণ করা হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুই মডেলের কার্যকর উপাদানগুলো নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ১৯৭০-এর দশকের সেমাউল কিংবা বার্ডের ‘কুমিল্লা মডেল’-এর মূল দর্শন কখনোই পুরোনো হয় না। তবে সেই সময়ের বাস্তবতা আর বর্তমান সময় এক নয়। তাই ২০২৬ সালে এটি প্রয়োগ করতে হলে আধুনিক ও সময়োপযোগী করে ‘সেমাউল প্লাস (লেটেস্ট ভার্সন)’ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে। এটি হবে কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ, যেখানে স্থানীয় মানুষের নিজস্ব চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণেই প্রায় ৯০ কোটি টাকা
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, দারিদ্র্যবিমোচনের কৌশল শিখতে ১০৪ জন কর্মকর্তা দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যাবেন। ১২টি ব্যাচে এই প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া দেশের ভেতরে ৩৮৬টি ব্যাচে প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ মিলিয়ে এ খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৯ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
এর পাশাপাশি কুমিল্লায় একটি ‘এসপিইপিপি প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা পুরো প্রকল্প ব্যয়ের ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও আলাদাভাবে ৬১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি ১০টি কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অনুদানেও শতকোটি টাকা
প্রকল্পের আরেকটি বড় ব্যয়ের খাত বিভিন্ন ধরনের অনুদান। কমিউনিটি অবকাঠামো ও অকৃষি ব্যবসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কৃষি উপকরণ, কৃষি প্রকল্প ও অবকাঠামোর জন্য আরও ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দুই খাত মিলিয়ে অনুদানের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। ফলে বিদেশি ও দেশীয় প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ এবং অনুদান—এই কয়েকটি খাতেই ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
এর বাইরে অফিস সরঞ্জাম ও যানবাহন কেনার জন্যও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ। প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অফিস সরঞ্জাম কিনতে ১৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, তিনটি জিপ কিনতে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ৪১টি মোটরসাইকেলের জন্য প্রায় ১ কোটি ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কম্পিউটার, ক্যামেরা ও আসবাবসহ অন্যান্য সরঞ্জামের জন্যও পৃথক অর্থ রাখা হয়েছে।
আগের প্রকল্প টেকেনি, নতুন উদ্যোগেও প্রশ্ন
বিজ্ঞাপন
নতুন প্রকল্পের প্রস্তাবেই আগের একটি উদ্যোগের টেকসই না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ২০টি গ্রামে ‘বার্ড-কোইকা’ প্রকল্পের আওতায় রাস্তা, স্কুল, পানি সুবিধা, কমিউনিটি সেন্টার ও জীবিকা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কিন্তু বিদেশি অনুদান শেষ হওয়ার পর দুর্বল নজরদারি, স্থানীয় সরকারের কম মালিকানা এবং গ্রাম সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রকল্পটির কার্যক্রম টেকসই হয়নি বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আগের প্রকল্পের এমন অভিজ্ঞতার পরও নতুন উদ্যোগে ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো তৈরিতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য সমবায়, স্থানীয় নেতৃত্ব, জনগণের অংশগ্রহণ, কৃষি উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার মতো ধারণা বাংলাদেশে বহু বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ফলে এসব বিষয়ে নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় কতটা প্রয়োজন এবং নতুন প্রকল্পটি আগেরটির মতো অনুদাননির্ভর হয়ে পড়বে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণের পর পুনর্গঠন
প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে বার্ডের পরিচালক ড. শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কমিশনের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
ড. শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, কমিশন যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয়কে ‘জাস্টিফায়েড’ মনে না করবে, ততক্ষণ প্রকল্পটি ইতিবাচক বিবেচনা পাবে না। পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে আবার পাঠানো হবে।








