Logo

বোয়িংয়ের নতুন বিমান কেনা বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬:৫৩
বোয়িংয়ের নতুন বিমান কেনা বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক?
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে আরও বিমান (উড়োজাহাজ) কেনার আলোচনা সামনে আসার পর বাংলাদেশে এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় বিনিয়োগ এখন কতটা যৌক্তিক।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে আরও উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে আরেকটি ‘দারুণ চুক্তি’ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংয়ের মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছিল। ফলে সার্জিও গরের বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, ওই ১৪টির বাইরে বাংলাদেশ নতুন করে আরও উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না।

পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বৈদেশিক অর্থের চাপ সামলানোর কথা বলছে। এমন সময়ে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখলেও এর আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিশেষ করে আলোচনায় এসেছে—এই ক্রয় কি মূলত ভবিষ্যতের যাত্রী চাহিদা পূরণের জন্য, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো কিংবা শুল্কসংক্রান্ত চাপ মোকাবিলার কৌশলের অংশ? এর পেছনে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিবেচনা আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, কোনো ধরনের চাপের কারণে নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনা করেই বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।

৭০ থেকে ৮০ উড়োজাহাজের চাহিদার কথা সরকারের

হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যেই দেশের এভিয়েশন খাতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলক কম। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত বাজার হিস্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭৫ শতাংশ বাজার বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর নিয়ন্ত্রণে।

এ অবস্থায় দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর বহর বড় করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

১৪ বোয়িংয়ের চুক্তির মূল্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার

গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।

বিজ্ঞাপন

তখন বিমান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এসব উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এদিকে ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসও বাংলাদেশকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত বহরে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।

যাত্রী বাড়লে উড়োজাহাজের প্রয়োজনও বাড়বে

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী বিমান পরিবহন ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতের বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে এই সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটিতে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তবে ভবিষ্যৎ যাত্রী সংখ্যা বাড়বে—এমন পূর্বাভাসের ভিত্তিতে উড়োজাহাজ কেনার আগে বহরের আকার, কোন রুটে বিমান চালানো হবে, পরিচালন ব্যয় কত হবে এবং লাভজনকভাবে সেগুলো ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা—এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, এখন অর্ডার দিলে তুলনামূলক কম দামে উড়োজাহাজ পাওয়ার সুযোগ থাকে। ভবিষ্যতে যাত্রী সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ হতে পারে। তাই সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আগে অর্ডার দিলে দাম কম হয়। আগামী ১০ বছরে যাত্রী হবে এখন থেকে দুই বা আড়াই গুণ বেশি। ফলে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখন দেশের এভিয়েশন খাত বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে জিম্মি। তারাই বাজারের ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।’

বিজ্ঞাপন

তবে বড় বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘বড় বিমান বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কি-না সেটি বড় প্রশ্ন। বিমান গত ৫৪ বছরে নিজেদের লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি। এটা সরকারি কর্পোরেশন হিসেবে তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সক্ষম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হলে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজগুলো তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে’।

তার মতে, যাত্রী বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা করা গেলে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রশ্নও উঠছে

আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, উড়োজাহাজ কেনার পেছনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ও মার্কেটিং কৌশল স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘বাজারের কথা চিন্তা করলে বিমানের ক্যাপাসিটি বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদের কৌশল কী? তারা কি চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েছে, নাকি কেনাটাই তাদের কৌশল- এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ২৫টি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কি-না সেই আলোচনা তো আছে’।

তবে পরিকল্পিতভাবে বহর বাড়ানো গেলে এর সুফল পাওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। এ জন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়; দক্ষ জনবল, পাইলট, প্রকৌশলী, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তবে এটিও সত্যি যে যথাযথ পরিকল্পনা নিতে পারলে এই পরিকল্পনা তেকে বাংলাদেশ লাভবানও হতে পারবে। সেজন্য শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়, বরং পর্যাপ্ত প্রকৌশলী ও পাইলট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে’।

সরকারের যুক্তি, সক্ষমতা না বাড়ালে বাজার হারাবে

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তাই তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উড়োজাহাজ কেনাকাটা করা হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ৭০ থেকে ৮০টি বা তারও বেশি উড়োজাহাজের চাহিদা রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগতভাবে বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট বহরের সক্ষমতা বাড়ানো না হলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিও থাকবে।

ফলে বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি শুধু ক্রয়মূল্যের হিসাবেই দেখার সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা, আন্তর্জাতিক রুট, পরিচালন দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, অর্থায়নের উৎস এবং বহর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক পরিকল্পনার ওপরই নির্ভর করবে এই বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে, নাকি আর্থিক চাপ বাড়াবে।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD