ট্রেনে স্টারলিংক চালুর ছয় মাসেই একের পর এক চুরি

চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা স্টারলিংক সেবায় শুরুতেই বড় নিরাপত্তা সমস্যার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কার্যক্রম শুরুর ছয় মাসের মধ্যেই পরীক্ষামূলক সেবার আওতায় থাকা চারটি আন্তঃনগর ট্রেনে একাধিকবার চুরি হয়েছে মূল্যবান স্টারলিংক যন্ত্রপাতি।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে স্টারলিংকের ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা। ট্রেনের ছাদে গিয়ে দেখা যায়, অ্যান্টেনা স্থাপনের জায়গায় পড়ে আছে শুধু খালি হোল্ডার। একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে পরীক্ষামূলক তালিকায় থাকা পারাবত এক্সপ্রেস, পর্যটক এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসেও।
কিছু ক্ষেত্রে চুরি হওয়া সরঞ্জাম পুনরায় স্থাপন করা হলেও পরে আবারও তা চুরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে একদিকে সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান প্রযুক্তি সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে যাত্রীদের জন্য চালু করা বিনামূল্যের ইন্টারনেট সেবা।
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে চারটি ট্রেনেই স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছিল। তবে, উপবন এক্সপ্রেসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে এবং অন্য ট্রেনগুলোতেও একই ধরনের ঘটনার খবর পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আজই (১ সেপ্টেম্বর) ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে।’
বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, সে বিষয়ে আমরা খুব শিগগিরই একটি সমন্বিত সভায় বসতে চাইছি। আমাদের সক্ষমতারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে এত দামি যন্ত্রপাতি রক্ষা করাও কঠিন। প্রতিটি ট্রেনে স্টারলিংক সেবা স্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরাও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাজ করছি।’
যেভাবে কাজ করে ট্রেনের স্টারলিংক
চলন্ত ট্রেনে ইন্টারনেট সরবরাহের পুরো ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ছাদে স্থাপিত ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা বা স্যাটেলাইট টার্মিনাল। এটি মহাকাশে থাকা স্টারলিংক স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারনেট সংকেত গ্রহণ করে। এরপর ট্রেনের ভেতরে থাকা নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে সেই সংযোগ ওয়াই-ফাই হিসেবে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
তাই ছাদের অ্যান্টেনা কিংবা বগির অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক ডিভাইসের যেকোনো একটি চুরি হলে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়তে পারে। যাত্রীদের জন্য কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওয়াই-ফাইয়ে যুক্ত হওয়ার সুবিধার পেছনে এভাবেই একাধিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমাদুর রহমান জানান, চুরি হওয়া যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, সরকারের ‘সবার জন্য ইন্টারনেট’ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই চলন্ত ট্রেনে এই স্যাটেলাইট সেবা চালু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে হাজারও মানুষ বিনামূল্যে সংযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। মাঝে মাঝে কিছু যন্ত্রপাতি চুরি হলেও আমরা তা দ্রুত নতুন করে বসিয়ে দিচ্ছি। সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে বিএসসিএল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ছয় মাসে ১৮ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার
চলতি বছরের ১৩ মার্চ দেশে প্রথমবার চলন্ত ট্রেনে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক উচ্চগতির স্টারলিংক ইন্টারনেটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তায় রয়েছে বিএসসিএল।

পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসে প্রাথমিকভাবে বিনামূল্যে এই ওয়াই-ফাই সেবা দেওয়া হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘপথের যাত্রায় স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট কতটা কার্যকর এবং যাত্রীরা সেবাটি কীভাবে গ্রহণ করেন, তা যাচাই করা।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, চারটি ট্রেনে যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে যেসব রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল কিংবা অনুপস্থিত, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যাত্রীদের জন্য কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে।
রেলওয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক সাড়া মিললেও দামি যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক ট্রেনে চুরি এবং প্রতিস্থাপনের পর আবারও সরঞ্জাম হারানোর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের মহাপরিচালকের সঙ্গে ৩১ আগস্ট যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে উপবন এক্সপ্রেসের অ্যান্টেনা চুরি, নিরাপত্তা ঘাটতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বিষয়টি নিয়ে এডিজি (অপারেশন)-এর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরদিন এডিজির সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রেল ছাড়িয়ে বাস-ফেরিতেও স্টারলিংক
বিজ্ঞাপন
পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেনে সাড়া পাওয়ার পর স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট সেবা অন্যান্য গণপরিবহনেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএসসিএলের। রাজধানীর নারীদের জন্য নির্ধারিত ‘পিঙ্ক বাসে’ পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংক চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দূরপাল্লার বাস ও ফেরিতেও এ সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিএসসিএল ভবিষ্যতে ট্রেন, বাস ও ফেরির জন্য একটি সমন্বিত ‘একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনা করছে। এর ফলে একজন যাত্রী একটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই বিভিন্ন গণপরিবহনে ইন্টারনেট সুবিধা নিতে পারবেন।
বিশেষ করে যেসব সড়ক ও নৌপথে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, অনিয়মিত বা একেবারেই নেই, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে এই সেবা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তি সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। চুরি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে আন্তঃনগর সব ট্রেনে বাণিজ্যিকভাবে স্টারলিংক ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।








