সরকারি স্কুল-কলেজের হাজার কোটি টাকায় নজর সরকারের

দেশের সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ে থাকা অর্থের পরিমাণ অন্তত হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে অব্যয়িত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা এই অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ফান্ডে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন অনেক অধ্যক্ষ।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর ঢাকা কলেজের হিসাবেই দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছাত্র সংসদ ফি বাবদ জমা হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮ টাকা। ১৯৯৩-৯৪ সালের পর কলেজটিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলেও দীর্ঘদিন এই ফি আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন তপশিলভুক্ত খাতে ব্যয় করতে না পারা আরও ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার ৯৯২ টাকা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে রয়েছে।
ইডেন কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনও নব্বইয়ের দশকের পর আর হয়নি। বর্তমানে ভর্তির সময় ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া না হলেও কলেজটির তহবিলে এ খাতে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০৮ টাকা জমা রয়েছে। অন্যান্য তপশিলভুক্ত খাতে অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৯ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০ টাকা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নোয়াখালী সরকারি কলেজেও ছাত্র সংসদ ফি ও অন্যান্য খাতে বড় অঙ্কের টাকা অব্যয়িত রয়েছে। কলেজটির হিসাবে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৫৩০ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার ২০১ টাকা জমা রয়েছে।
২০ কলেজেই শতকোটি টাকার বেশি
বিজ্ঞাপন
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে রাজধানীসহ দেশের ২৮টি বড় কলেজ তাদের অব্যয়িত অর্থের হিসাব দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছাত্র সংসদ খাতে অব্যয়িত রয়েছে ১০ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭২ টাকা। একই সময়ে বিভিন্ন তপশিলভুক্ত খাতে পড়ে আছে আরও ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই ২০ প্রতিষ্ঠানেই শতকোটি টাকার বেশি অব্যয়িত রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব অর্থ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তাই হিসাব নেওয়ার পাশাপাশি অব্যয়িত অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, সরকারি বিএম কলেজ, সরকারি বিএল কলেজ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও ছাত্র সংসদ ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ পড়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া আনন্দমোহন সরকারি কলেজ, সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, নেত্রকোনা সরকারি কলেজ এবং সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজেও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
কেন খরচ হচ্ছে না এই টাকা
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভর্তির সময় সাধারণত ২৫ থেকে ৩০টির মতো খাতে ফি নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিটি খাতে প্রতিবছর সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। কোনো কোনো খাতের অর্থ এক বছর অব্যয়িত থাকলেও পরবর্তী বছর বা কয়েক বছর পর বড় কোনো আয়োজন কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ভাষ্য, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান মেলা, শিক্ষা সফর, আসবাব মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে নিয়মিত অর্থ জমা হলেও প্রতিবছর সেসব কার্যক্রম করা সম্ভব হয় না। আবার শিক্ষার্থী বেশি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনবল কাঠামোর বাইরে খণ্ডকালীন শিক্ষক বা কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হয়। এসব ব্যয়ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে মেটাতে হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তাদের মতে, করোনা মহামারি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের পরিস্থিতিতে অনেক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের আপত্তি
রাজধানীসহ অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, এসব অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই ব্যয় করার কথা। ফলে সরাসরি সরকারি কোষাগারে নিয়ে গেলে প্রয়োজনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থসংকটে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কে এম ইলিয়াস বলেন, ছাত্র সংসদ ফি নেওয়া বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে ওই খাতে জমা থাকা অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে নিতে চায় এবং বিষয়টি তদারকি করছে।
সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় টাকা জমা দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। এ বিষয়ে অধ্যক্ষরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অব্যয়িত অর্থ পরবর্তী বছর ব্যয়ের সুযোগ রাখার অনুরোধ করেছেন।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ তাদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয়। করোনা ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন কারণে কিছু অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নীতিমালার আওতায় আনার পরামর্শ
মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আজাদ খান বলেন, অব্যয়িত অর্থ সরকার নিয়ে নিলে ছোট স্কুল-কলেজগুলো বেশি সমস্যায় পড়তে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানের আয় ও সঞ্চয় বেশি হওয়ায় সেখান থেকে একটি অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ঢালাওভাবে অর্থ না নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সময় জনবল কাঠামোর বাইরে খণ্ডকালীন লোক নিয়োগ এবং আকস্মিক বিভিন্ন ব্যয় করতে হয়। এসব অর্থ যদি সরকার নিয়ে নেয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়তে পারে। তার মতে, টাকা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালার আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এদিকে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান ভিন্ন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছরের অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে তা না হওয়ায় মাউশির মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ না মানলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪ অনুযায়ী, দেশে একসঙ্গে স্কুল ও কলেজ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৫১৪টি। এর মধ্যে সরকারি ৬৩টি। আর সরকারি কলেজ রয়েছে ৬৪২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করায় অব্যয়িত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।








