Logo

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বছরে বাড়তি লাভ ৯০ কোটি টাকা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৪২
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বছরে বাড়তি লাভ ৯০ কোটি টাকা
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। রাজধানীর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম বড় আকারের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রতিবছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক বছর আগে। প্রকল্পটির আওতায় ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ বিভাগ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তিটি করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমিনবাজারের প্রকল্পকে শুধু প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার বিষয় হিসেবে দেখলে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হবে না। এর সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ কার্বন অর্থনীতির বিষয়গুলোও যুক্ত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বছরে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রকল্পটি চীনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বড় অংশ সিটি করপোরেশনকে বহন করতে হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, প্রকল্পটিতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। চীনের সিএমইসি গ্রুপের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অর্থায়নের সঙ্গে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ডিবিএস, এনডিবি ও ব্যাংক অব চায়নাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

বিদ্যুতের মূল্য নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই দাম নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু এখানে শেষ পর্যন্ত দাম দাঁড়াবে ১০ টাকার নিচে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট পাবে।’

বিজ্ঞাপন

কার্বন ক্রেডিট মূলত এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো কিংবা অপসারণের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় নির্গমন কতটা কমছে, তা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিমাপ, প্রতিবেদন এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করার পর কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বাংলাদেশের কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি প্রয়োগ, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কার্বন শোষণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। উচ্চ আর্দ্রতাযুক্ত বর্জ্য উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানোর জন্য দেশটির ইনসিনারেটর গ্রেট প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি রিফিউজ-ডেরাইভড ফুয়েল বা আরডিএফ এবং বায়োমেথানেশনের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমেও বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ রয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কার্বন ক্রেডিটের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ল্যান্ডফিলে জৈব বর্জ্য পচনের সময় মিথেন তৈরি হয়, যা শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। জৈব বর্জ্য নিয়ন্ত্রিত ডাইজেস্টারে নিয়ে মিথেন সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা গেলে একদিকে বিকল্প জ্বালানি পাওয়া সম্ভব, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত মিথেন নিঃসরণও কমানো যায়।

তবে প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে ঠিক কত অর্থ পাওয়া যাবে, তা আগেভাগে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নির্গমন হ্রাসের পরিমাণ, যাচাই পদ্ধতি, ক্রেডিটের মান, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুনের ওপর এর মূল্য নির্ভর করবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী, সরকারকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন যে, কার্বন ট্রেডিং নিয়ে সরকার ইতিবাচক চিন্তা করছে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই হবে না, এর মাধ্যমে দেশে আরও সুশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠতে পারে। কাঁচা বর্জ্য থেকে সৃষ্ট দুর্গন্ধ ও দূষণ কমানোর পাশাপাশি মিথেন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর চাপও কমবে।

ড. আইনুন নিশাতের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। চীনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিংয়ের সুযোগ তৈরি হওয়াকে তিনি আশাব্যঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কার্বন ট্রেডিং নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এ উদ্যোগ এগিয়ে যাওয়ায় সরকারের পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি দিকটি স্পষ্ট হচ্ছে। এখন এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD