টয়লেট খেকো প্রকৌশলী তবিবুরের নতুন টার্গেট

তবিবুর রহমান তালুকদার। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য। শেখ হাসিনা সরকারের সময় ল্যাট্রিন, গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হন তিনি। এই প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরও অদৃশ্য এক কারণে নতুন করে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার নতুন একটি প্রকল্পের পরিচালক বানানো হয়েছে তাকে। এই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ পেলে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
তবে হাল ছাড়েননি এই প্রকল্প কর্মকর্তা। কালোর টাকা প্রভাবে আবারো পিডির চেয়ারে বসেন। ২০ কোটি টাকায় কিনে দেন চেয়ার। তিনি নিজেই স্বীকার করে বলেন, ‘টাকা যার, ক্ষমতা তার। যখন যে দল আসে, আমি সেই দলকে ম্যানেজ করে চলি। কাউকে ভয় পেয়ে চলি না। আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি বন্ধ করো। না হলে জীবন হারাবে। কেউ লাশ খুঁজে পাবে না।’
সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় নেওয়া গরিবের ল্যাট্রিন, গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার নামে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। আগামী ডিসেম্বরে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে, কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৪৭ শতাংশ। অথচ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৭০ শতাংশ অর্থ। যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোও দুর্নীতিতে সয়লাব। বেশিরভাগ কাজেই দরপত্রের স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৮০ শতাংশ পাবলিক টয়লেট ইতোমধ্যেই অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত। অভিযোগ আছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রকল্পের টাকা লোপাট করে দেশে-বিদেশে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন প্রকল্পটির একচ্ছত্র অধিপতি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। খোদ সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর প্রতিবেদন ও নিজস্ব অনুসন্ধানে প্রকল্পটিতে পুকুরচুরির তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গরিব মানুষের জন্য নেওয়া প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ৪৭ শতাংশ, অথচ ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ। নির্মিত পাবলিক টয়লেটের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবহার হচ্ছে না। ১২২টি ল্যাট্রিনের একটিও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশ টয়লেটও ব্যবহারের অনুপযোগী। ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়।
দেশের আট বিভাগের ৩০ জেলার ১৮ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৫৪টি বড় পানির স্কিম, ৩ হাজার ২৭৮টি ছোট পানির স্কিম এবং ২ লাখ ২০ হাজার ৮৭৪টি টুইন-পিট ল্যাট্রিন। ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৪৭ শতাংশ এবং অবকাঠামোগত কাজের অগ্রগতি ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অথচ আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ।
কাজের অগ্রগতির তুলনায় অর্থ ব্যয়ের এই ব্যবধানই প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৪৭টি পাবলিক টয়লেট সরেজমিন পরিদর্শন করে ৩৮টি ব্যবহারহীন অবস্থায় দেখা গেছে। অর্থাৎ ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ পাবলিক টয়লেটই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না। কোনো কোনো টয়লেট বছরে মাত্র দুই-তিন দিন ব্যবহারের পর বাকি সময় বন্ধ থাকতে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
এলাকাবাসীর দাবি, মানুষের ব্যবহারের জন্য সরকারি অর্থে অবকাঠামো নির্মাণের পর সেটি যদি ব্যবহারই না হয়, তাহলে কেন সরকারি টাকা ব্যয় করা হয়েছে? এ ছাড়াও টয়লেটের রিংয়ের নিচে ও বাইরে নির্ধারিত উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এতে নির্মাণের স্থায়িত্ব ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি স্থাপনা নির্ধারিত কারিগরি শর্ত না মেনে তৈরি হলে তার দায় কারÑসেটিও তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে নির্মিত হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ৩৬টি হাত ধোয়ার স্টেশনের মধ্যে ১১টি ভালো অবস্থায় পাওয়া গেলেও সেগুলো ব্যবহার করা হয় না।
বাকি স্টেশনগুলোর কোথাও টাইলস ভাঙা, কোথাও ফিটিংস নষ্ট, আবার কোথাও পানিতে অস্বাভাবিক মাত্রায় আয়রনের উপস্থিতির কারণে সেগুলো অব্যবহৃত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার অবকাঠামো নির্মাণের পর সেটির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণই নিশ্চিত করা যায়নি। ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টিকে ব্যবহারের অনুপযোগী পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রায় ৮৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সরেজমিন কোনো কোনো জেলায় পানির ছোট স্কিমের কাজ বন্ধ পাওয়া গেছে। পাবলিক টয়লেট ও কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট নির্মাণকাজ চলমান। ইতোমধ্যে কয়েকবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি।
বিজ্ঞাপন
পরিদর্শনকৃত পানির ছোট ৪৭টি স্কিমের মধ্যে চারটির (৯%) নির্মাণকাজ স্পেসিফিকেশন অনুসারে মাটির ৩ ফুট নিচে স্থাপন করা হয়েছে এবং ২১% এইচডিপিই পাইপ ব্যবহার করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৩টি (১১%) স্কিমের কাজ স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণে ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে গেছে এবং কলাম বাঁকা হয়ে গেছে। পাবলিক টয়লেটে প্রবেশের জন্য দুই ধরনের র্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে র্যাম্পের গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়নি।
এ কারণে পাবলিক টয়লেটগুলো বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়নি। পাবলিক টয়লেটের ৪৭টির মধ্যে ৩৮টি (৮০ দশমিক ৮৫%) বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না। কোনো কোনো টয়লেট বছরে মাত্র ২-৩ দিন ব্যবহার হলেও বাকি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে। প্রকল্পের ৩৬টি হাত ধোয়ার স্টেশনের মধ্যে ১১টি (৩০%) ভালো অবস্থায় থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা হয় না। বাকি ৭০% স্টেশনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, টাইলস ভাঙা, ফিটিংস নষ্ট এবং পানিতে অস্বাভাবিক আয়রনের উপস্থিতির কারণে সেগুলো অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত।
সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিদর্শনকৃত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নির্মিত ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টি (৮৯ দশমিক ৪৭%) ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পাওয়া গেছে। এ অবস্থার কারণÑপরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য অর্থের জোগান না থাকা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব এবং ফিটিংস চুরির ভয়। পরিদর্শনকৃত ১২২টি (১০০%) ল্যাট্রিনই স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী স্থাপন করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
যেমন রিংয়ের নিচে ৩ ইঞ্চি স্থানীয় বালি, বালির ওপর ৩ ইঞ্চি খোয়া এবং এর ওপর রিং স্থাপন; একইভাবে রিংয়ের বাইরে ৬ ইঞ্চি পুরো বালি দেওয়া হয়নি। ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া পানির বড় স্কিমগুলো জলাশয়, পুকুর ও ডোবা ভরাট করে করা হয়েছে, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দুর্বলতার মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের কাজ নিবিড় পরিবীক্ষণের অভাব; স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণকাজ না করা; প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই প্রকল্প গ্রহণ এবং নিয়মিত পিআইসি ও পিএসসি সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং চুক্তির শর্তানুসারে কাজ সম্পন্ন করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
জানতে চাইলে আইএমইডির একজন মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) বলেন, গত জুন মাসে এই প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। আমাদের ওয়েবসাইটেও এই প্রতিবেদন দেওয়া আছে। পরিবীক্ষণে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগের কারও নজরে এই প্রতিবেদন আসেনি বললে, এটা হবে দায়িত্ব এড়ানোর শামিল। স্থানীয় সরকার বিভাগকে ভবিষ্যতে সমজাতীয় প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা জরিপ করা এবং ভৌত কাজের ক্ষেত্রে এর রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে সংস্থান হবে, তা নিশ্চিত হতে হবে। অন্যথায় সরকারি অর্থের অপচয় হবে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রকল্পের অর্থ লোপাটের একচ্ছত্র ‘সম্রাট’ প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার। প্রকল্পের বিল ও ঠিকাদারকে দেওয়া তার চেক তার একক স্বাক্ষরে পাশ হয়ে যায়। এতে নির্বাহী প্রকৌশলী, জেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা সহকারী প্রকৌশলীর কোনো করণীয় নেই। এই সুযোগে তিনি পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়ে নজিরবিহীন লুটপাট করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের দোসর তবিবুর অবৈধ টাকায় সিরাজগঞ্জে মায়ের নামে ছয়তলা আলিশান বাড়ি করেছেন। ধানমন্ডি-২৭-এ কিনেছেন ৫ হাজার স্কয়ার ফুটের বাণিজ্যিক ফ্লোর। এ ছাড়া ধানমন্ডিতে দুটি এবং ব্যাংককে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। দেশে রয়েছে একাধিক গাড়ি। অঢেল সম্পদের অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যক্তি জীবনে নারী কেলেঙ্কারীসহ নানা অপকর্মেও জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিয়ে করেছেন ছয়টি। একাধিক স্ত্রীকে আলাদা আলাদা বাড়িও করে দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার এসব দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানও করছে বলে জানা গেছে। তবে প্রভাব খাটিয়ে দুদকে তিনি ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের এক প্রতিনিধি বলেন, ‘লেখালেখি বন্ধ করো। বেশি বাড়াবাড়ি করলে জেলে পচে মরতে হবে। তাই জীবন রক্ষায় নিউজ লেখা বন্ধ করো।’
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’








