Logo

সাত বছরেও খোলেনি শাহবাগ শিশুপার্ক, অপেক্ষায় নতুন প্রজন্ম

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৩২
সাত বছরেও খোলেনি শাহবাগ শিশুপার্ক, অপেক্ষায় নতুন প্রজন্ম
ছবি: সংগৃহীত

এক বছরের মধ্যে সংস্কার শেষ করে খুলে দেওয়ার কথা ছিল রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্ক। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির পর পেরিয়ে গেছে সাত বছরেরও বেশি সময়। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় শিশু-কিশোরদের অন্যতম পরিচিত এই বিনোদনকেন্দ্র এখন অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

একসময় যে পার্কে প্রতিদিন শিশুদের কোলাহল আর বিভিন্ন রাইডের ব্যস্ততা থাকত, সেখানে এখন নেই আগের কোনো রাইড। কবে আধুনিকায়নের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে এবং কবে শিশুদের জন্য পার্কটি খুলে দেওয়া হবে, সে বিষয়েও এতদিন সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ এবং নানা প্রশাসনিক কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাইড কেনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে ২০২৭ সালের জুনে পার্কটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে দীর্ঘ এই বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। নাগরিকদের অভিযোগ, আধুনিকায়নের নামে বছরের পর বছর পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে ঢাকার একটি প্রজন্মের শিশু-কিশোররা শৈশবের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্রটির আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, শাহবাগ শিশুপার্কের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দীর্ঘদিন এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তার মতে, বিষয়টি শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা নয়, বরং সরকারের গাফিলতিরও প্রতিফলন। তিনি বলেন, সরকার একটি প্রজন্মের শিশুদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে এবং এজন্য সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে দ্রুত পার্কের কাজ শেষ করার তাগিদ দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

যে পার্ক ছিল শিশুদের প্রিয় ঠিকানা

শাহবাগের এই শিশুপার্ক একসময় রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ছিল। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা তো বটেই, দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে এখানে আসতেন। তুলনামূলক কম খরচে বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুযোগ থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও পার্কটি ছিল বেশ আকর্ষণীয়।

পার্কটি বন্ধ হওয়ার পর সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। সাত বছরের বেশি সময়ে বেড়ে ওঠা অনেক শিশুই সেখানে রাইডে চড়ার সুযোগ পায়নি। রাজধানীতে খেলার মাঠ ও বিনোদনকেন্দ্রের সংকটের মধ্যেই এমন একটি পরিচিত পার্ক দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিশুদের স্বাভাবিক খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো শিশুপার্কের বড় একটি অংশে নির্মাণ করা হয়েছে ভূগর্ভস্থ পার্কিং। পার্কিংয়ের ছাদ মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচু। একসময় যেসব রাইডে শিশুদের ভিড় থাকত, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। পার্কের সামনের অংশে বসানো হয়েছে নয়টি টং দোকান।

গত ২৯ আগস্ট বিকেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মুগদা থেকে শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে এসেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘আগে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবকরা বাচ্চাদের নিয়ে এখানে আসতেন। মাত্র ১০ টাকায় ছয়টি রাইড ব্যবহার করতে পারত শিশুরা। ছুটির দিনগুলোতে পার্কে কোলাহল লেগে থাকত। কিন্তু এখন সংস্কারের নামে পার্কটি সাত বছর ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়।’

পার্কের ফটকের ভেতরে গত ছয় মাস ধরে টং দোকানে চা-পান বিক্রি করেন আতাউর। তার ভাষ্য, সরকারি ছুটির দিনে এখনো অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে পার্কের সামনে আসেন। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় হতাশ হয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়। যাওয়ার সময় অনেকেই সরকার ও সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করেন।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের শুরু যেভাবে

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ‘স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ–তৃতীয় পর্যায়’ প্রকল্পের আওতায় শাহবাগ শিশুপার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণের উদ্যোগ নেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পার্কের বিদ্যমান রাইডগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় নতুন রাইড কেনা ও পার্ক আধুনিকায়নের জন্য ডিএসসিসিকে ৭৮ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে প্রস্তাবিত অর্থকে অপর্যাপ্ত মনে করে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন তা নাকচ করেন। এরপর সিটি করপোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে পার্কটি আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেয়।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পার্কের সামনে বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে সেটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ‘ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় পার্কটির উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে এ সময় পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের মে মাসে ডিএসসিসির মেয়রের দায়িত্ব নেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এরপর আবারও সিটি করপোরেশনের নিজস্ব উদ্যোগে পার্কটি আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য ৬০৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়।

২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এতে সরকারের দেওয়ার কথা ৪৮৩ কোটি টাকা। এর অর্ধেক অনুদান এবং বাকি অর্ধেক ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা ছিল। ডিএসসিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের জন্য রাখা হয় ১২০ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশ, ৪৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় শিশুপার্কের জন্য ১৫টি রাইড কেনা ও স্থাপনে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব রাইড আনার পরিকল্পনা ছিল। তবে দরপত্র চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রাইডগুলোর মূল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন আগে তৎকালীন মেয়র শেখ তাপস দেশ ছাড়েন। এরপর রাইড কেনার প্রক্রিয়াও থেমে যায়।

বিজ্ঞাপন

পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুরো প্রকল্পটি নতুন করে মূল্যায়ন করে ডিএসসিসি। রাইড কেনাসহ প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনার পর পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাধাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এর মধ্যেই কেটে গেছে প্রায় সাত বছর।

২০২৭ সালে চালুর আশা

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, শিশুপার্কের নিচে ভূগর্ভস্থ পার্কিং নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেওয়া প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে। এরপর পার্কের জায়গা ডিএসসিসিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে নতুন রাইড স্থাপনসহ পার্কের অন্যান্য কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কর্তৃপক্ষের আশা, পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে ২০২৭ সালের জুনে শাহবাগ শিশুপার্ক আবারও শিশু-কিশোরদের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পার্কের সংস্কার কাজের খোঁজখবর নিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করি, এবার প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD