শেষ মুহুর্তে আবুল খায়েরর টার্গেট শত কোটি টাকা

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ যেন তার কমিশনের হিসাবেই ভাগ হয়—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের একটি প্রকল্পে তার বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান টেড্র্রাস এর মিজানুর রহমানকে কোটি টাকার বিনিময়ে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এই প্রকৌশলী। শুধু একটি প্রকল্প নয়, দীর্ঘ চাকরিজীবনে গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা ও ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত ‘ঘুষ’ আদায়, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য। এবং স্বৈরাচারের দোসর সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্শিবাদ পুষ্ট প্রকৌশলী আবুল খায়ের।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পেয়েছেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের। তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে তিনি গোপালগঞ্জ জোনে প্রভাবশালী পোস্টিং পান বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আলম নামের এক ঠিকাদারের দাবি, প্রকল্পের কাজ ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর কমিশন দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন আবুল খায়ের। জানা গেছে, চট্টগ্রাম জোনে দায়িত্ব পালনকালে বড় প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবির অভিযোগ ছিল আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
সেখানে টেন্ডারকে ঘিরে একটি ‘পার্সেন্টেজ শেয়ারিং’ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে ঠিকাদারদের বিল আটকে দেওয়া, কাজের অনুমোদন বিলম্বিত করা কিংবা ভবিষ্যৎ কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ভয় দেখানো হয়। ঢাকায় এসে সেই কমিশনের হার আরও বেড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
এ কারণেই ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছে তিনি ‘মিস্টার ৫%’ নামে পরিচিত বলে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন কয়েকজন ঠিকাদার। সূত্র বলছে, আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর একটি হলো সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রাক্কলন, দরপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে প্রভাব খাটাতের এই প্রকৌশলী। রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে বড় প্রকল্পের টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে সত্যতা পেয়েছেন তদন্ত কমিটি। এছাড়াও কুমিল্লা জোনে দায়িত্ব পালনের সময় টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে আবুল খায়েরের বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। পরে তাকে কুমিল্লা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
এদিকে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতে দায়িত্ব পালনের সময় আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে এই অর্থের দুর্নীতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি তার সম্পদ নিয়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার নিজের ও স্বজনদের নামে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় রয়েছে অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। এ ছাড়া পূর্বাচল ও ন্যাশনাল হাউজিং এলাকায় জমি এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও খামারবাড়ি থাকার অভিযোগও রয়েছে। একদিকে সরকারি প্রকল্পে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ, অন্যদিকে টেন্ডারে কমিশন, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে আবুল খায়েরকে ঘিরে অভিযোগের পরিধি বিস্তৃত।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে যেসব আইন, বিধি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেসব বিধিমালা রয়েছে তা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। ব্যতিক্রম হচ্ছে চুনোপুঁটির বেলায় এসব আইন প্রয়োগের দু-একটি ঘটনা। তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে প্রভাবশালী চক্রের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় না। তিনি বলেন, আইন যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলকভাবে প্রয়োগ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথাকথিত বিভাগীয় পদক্ষেপ দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর ভূমিকা নিলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। প্রিয় পাঠক, আগামী পর্বে থাকছে কালোর টাকার মালিক প্রকৌশলী আবুল খায়ের
বিজ্ঞাপন








