Logo

জনস্বাস্থ্যর ৯ হাজার কোটির প্রকল্পে আনোয়ারের রাজত্ব

profile picture
বিশেষ প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:৫২
জনস্বাস্থ্যর ৯ হাজার কোটির প্রকল্পে আনোয়ারের রাজত্ব
মো. আনোয়ার হোসেন সিকদার

বরাদ্দের অঙ্ক ৯ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পের বিস্তৃতি সারা দেশে। আর সেই বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রাক্কলন ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় এক কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। প্রকল্প পরিচালক বদলেছেন, দপ্তরে এসেছে রদবদল; কিন্তু প্রভাবের বলয় থেকে বের হননি এস্টিমেটর মো. আনোয়ার হোসেন সিকদার।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, স্ত্রীর নামে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ নিশ্চিত করা, পরে সেই কাজ অন্যের কাছে ‘হাতবদল’ এবং বিল ছাড়ানোর ক্ষেত্রে অর্থ দাবির মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রভাবের এক অদৃশ্য কাঠামো। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বক্তব্যে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের প্রাক্কলন ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় আনোয়ারের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে প্রকল্পের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও তার অবস্থান থেকেছে অটুট।

ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, কাজের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হয় আনোয়ারকে। এর বাইরে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্পের কোনো কোনো প্যাকেজে প্রচলিত প্রক্রিয়ার বিপরীতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিশ্চিত করা হতো। এরপর সেই কাজের প্রাক্কলন তৈরি করা হতো। আগে কাজ, পরে এস্টিমেট এমন একটি অলিখিত প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।

এই অভিযোগের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন মেসার্স ওহি ট্রেডার্সের নাম। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে কাগজপত্রে রয়েছেন আনোয়ার হোসেন সিকদারের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্সে ওহি ট্রেডার্সের ব্যবসার ধরন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী।

এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—সরকারি প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তার স্ত্রী যখন একই ধরনের সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, যশোর ও চাঁদপুরে গ্রাউন্ড ওয়াটার বিভাগের বেশ কয়েকটি কাজ পায় ওহি ট্রেডার্স। পরে এসব কাজ অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া বা হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ওহি ট্রেডার্সের নামে দেওয়া কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ বই, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রকৃত বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য পরীক্ষা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তন হলেও আনোয়ার হোসেন একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার ফলে প্রকল্পের প্যাকেজ, প্রাক্কলন, দরপত্র ও কারিগরি প্রক্রিয়ার ওপর তার বিশেষ প্রভাব তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো প্রকল্প পরিচালকের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

আনোয়ার হোসেন সিকদারের সম্পদ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। তার মূল পদ সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। দশম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার সরকারি বেতন ৩৫ হাজার টাকার বেশি নয়, তবে তার রাজধানীতে কোটি টাকার অ্যাপার্টমেন্টসহ শতকোটি টাকার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের ‘খ’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়িতে তার পরিবারের একটি অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন প্রথমে জানান, তিনি সেখানে ভাড়ায় থাকেন। পরে তার কাছে ভাড়া বাসার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করার এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার অ্যাপার্টমেন্টটি তার স্ত্রীর নামে। তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৭ হাজার টাকা। সে হিসাবে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি অ্যাপার্টমেন্টের আনুমানিক মূল্য এক কোটি টাকার বেশি । এর সঙ্গে গ্যারেজের মূল্য যুক্ত হলে অঙ্ক আরও বাড়ে। রাজধানীতে আনোয়ারের পরিবারের আরও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

আগামী পর্বে থাকছে আনোয়ারের সম্পদের খোঁজে দুদক—

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD