ফায়ার সার্ভিসের ক্রয়ে হেলালের নীলা খেলা

দরপত্র হওয়ার আগেই নাকি ঠিক হয়ে যায় কাজের মালিক। দরপত্রের পর আসে কাগজের আনুষ্ঠানিকতা। সরকারি অর্থে কেনা জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামেও কমিশনের হিসাব, গুদামে দায়িত্বের বাইরে পছন্দের লোকজনের প্রভাব, আর বদলি-পদায়ন ঘিরে লাখ লাখ টাকার লেনদেন—অভিযোগের এমন স্তরবিন্যাসে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্রয় ও গুদাম শাখা।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগকারীদের আঙুল অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও গুদাম) মো. হেলাল উদ্দিন খানের দিকে। গতকাল মঙ্গলবার দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক ফায়ার ফাইটার।
অভিযোগে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ এ শাখাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয়, যার প্রভাব ক্রয়প্রক্রিয়া থেকে সরবরাহ এবং গুদাম ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত। কোনো কোনো কাজের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে সমঝোতা, কাজের বিনিময়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পোশাক ও বুট কেনাকাটায় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় ঘনিষ্ঠদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামেও ‘শতাংশ’?
বিজ্ঞাপন
সূত্র বলছে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় দরপত্র হওয়ার কথা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। অথচ অভিযোগকারীর দাবি, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই ঠিক হয়ে যায় কে কাজটি পাবেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে আগে বোঝাপড়া করা হয়; পরে দরপত্রের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোয়। কাজ পাওয়ার বিনিময়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগও রয়েছে। সরকারি দরপত্র ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কারণ প্রতিযোগিতার ফল যদি দরপত্র খোলার আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়াটাই অনিয়মের মধ্য করা হয়। দরপত্রের তারিখের আগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেন এই চক্রের সদস্যরা। ফায়ার সার্ভিসের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম মানে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীর জীবনরক্ষার ঢাল। সেই সরঞ্জাম কেনাকাটাতেও কমিশনের অভিযোগ উঠেছে। সূত্র বলছে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পোশাক, বুটসহ বিভিন্ন কেনাকাটায় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশনের ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহেও কমিশন লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে বিল-ভাউচার যাচাই-বাছাই, বাজারদর কত ছিল, দরপত্রে সর্বনিম্ন ও অন্যান্য দর কত ছিল, কার্যাদেশের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত করা হয়েছে, সরবরাহকৃত পণ্যের মান ও নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য একই কি না, পণ্য গ্রহণের আগে যথাযথ মান পরীক্ষা হয়েছিল কি না। এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর মিললেই আর্থিক লেনদেনের চিত্র মিলবে।
বিজ্ঞাপন
গুদামে নিয়মের বাইরে ‘বলয়’?
ক্রয়ের পর সরকারি সম্পদের পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব গুদামের। অথচ অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত গুদামরক্ষকের বাইরে পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে গুদামের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। এভাবে গড়ে উঠেছে একটি অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
বরিশাল থেকে ঢাকায়—১৪ লাখ টাকার ‘মূল্য’?
বিজ্ঞাপন
মো. হেলাল উদ্দিন খাঁনের বরিশাল থেকে ঢাকায় বদলির ক্ষেত্রে ১৪ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অভিযোগটি এতটাই গুরুতর যে, বদলির নোটশিট থেকে শুরু করে অনুমোদনের ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের থেকে উঠে আসে আর্থিক লেনদেনের নথি। তথ্য বলছে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মো. হেলাল উদ্দিন খান অধিদপ্তরের নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময় প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
নিয়োগ-বদলি শাখার পুরনো অধ্যায়
বরিশালে দায়িত্ব পালনের সময় পরিদর্শকদের কাছ থেকে লাইসেন্স প্রতি ‘মাসোহারা’ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। কমিশন ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে মো. হেলাল উদ্দিন খানের মুঠো ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বিজ্ঞাপন








