কৃষক দলের রুবেলের ফাঁদে নিঃস্ব উজিরপুরের কৃষকরা

কৃষকের স্বপ্নে ফসল, আর সেই স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সার, বীজ, সেচ ও সরকারি সহায়তার প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশাকেই পুঁজি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সদস্য সচিব রুবেল সরদারের বিরুদ্ধে। টিউবওয়েল, সার ও বীজ দেওয়ার আশ্বাসে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর মধ্যে নয়না গ্রামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় অভিযোগ অনুযায়ী, টিউবওয়েল, সার ও বীজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কৃষকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। কৃষকরা এসব সুবিধার আশায় টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কৃষক দলের প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন ভুক্তভোগীদের কয়েকজন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, “আমরাও বিএনপি পরিবার। সারাজীবন ধানের শীষে ভোট নিয়েছি। কোনো দিন কোনো সুবিধার কথা চিন্তা করিনি। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর আমরা পেয়েছি নতুন বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার কৃষকবান্ধব হলেও বরিশালের গুঠিয়া ইউনিয়নের কৃষক দলের নেতারা টাকা ছাড়া কোনো সুবিধা দেন না।”
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, পাওয়ার টিলার, টিউবওয়েল কিংবা কৃষি বীজ দেওয়ার নাম করে ইউনিয়ন কৃষক দলের সদস্য সচিব রুবেল সরদার লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, মৌখিক আশ্বাসে বিশ্বাস করে নয়না গ্রামের আবুল কালামের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের উপস্থিতিতে ওই টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী বলেন, টাকা দেওয়ার প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তিনি টিউবওয়েল পাননি। টাকা ফেরত চাইতে গেলে হামলা-মামলার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
আবুল কালামের দাবি, “গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কিস্তিতে টাকা তুলে টিউবওয়েলের জন্য দিয়েছি। এখন ১৮ মাস ধরে ব্যাংকের সুদ গুনছি, কিন্তু টিউবওয়েল পাইনি। টাকা গেল, টিউবওয়েলও গেল। টাকা ফেরত চাইতে গেলে ভয় দেখানো হয়।
এ ঘটনায় বরিশাল জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক/সদস্য সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তার। বরং রুবেল সরদারকে তারা শেল্টার দিচ্ছেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সার ও বীজ বিতরণের পাশাপাশি কৃষি উপকরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। অভিযোগে বলা হয়, উজিরপুরের গুঠিয়া ইউনিয়নের হরিদ্রাপুর গ্রামের জুয়েল সিকদারের কাছ থেকে পাওয়ার টিলার (ট্রাক্টর) দেওয়ার নাম করে ৭২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো পাওয়ার টিলার পাননি। বরং টাকা ফেরত চাইতে গেলে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে গুঠিয়া ইউনিয়নের সেনেরহাট গ্রামের রাকিবের কাছ থেকে খাল খনন কর্মসূচিতে কাজের শেয়ার দেওয়ার নাম করে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি টিউবওয়েল দেওয়ার নামেও ৩৫ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়ভাবে আরও কৃষকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন ভুক্তভোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। আরও কয়েকজনের নাম স্থানীয়ভাবে শোনা গেলেও রুবেল সরদারের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি শুধু টিউবওয়েল, সার কিংবা কৃষি উপকরণ দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এক ব্যক্তির জমি অন্য ব্যক্তিকে দখল করে দেওয়ার কথা বলেও লাখ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে ওই কৃষক দলের নেতার বিরুদ্ধে। গুঠিয়া গ্রামের ফুরফুরি নামে এক নারীর দোকানঘরের জমি দখল করে দেওয়ার কথা বলে দুই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, টাকা নেওয়ার পরও ক্রয়কৃত দোকানের জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, টাকা ফেরত না পেয়ে ওই পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং পরিবারের একজন বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একাধিক অভিযোগের সূত্রে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে কৃষি সহায়তা, সরকারি কর্মসূচি কিংবা জমি সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়ার নামে যদি অর্থ লেনদেন হয়েছে। এই বিষয়টি সরকার প্রধানের গুরুত্ব দেওয়ার উচিত। কারণ সরকারি তহবিল থেকে কৃষি উপকরণ ফ্রি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে কৃষক দল নেতা কিভাবে টাকা দেন সেই বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে অর্থ প্রদানকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থাও করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগের বিষয়ে রুবেল সরদারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








