ড. আফসার আলীর কব্জায় মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট

দেশের কৃষি খাতের সুরক্ষায় নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে দুর্নীতি, সরকারি নথি গায়েব এবং চাকুরির বিধিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মহাপরিচালক ড. আফসার আলী এবং তার শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই বিশৃঙ্খলা ও তোষণ নীতির অভিযোগ এনেছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিজ্ঞাপন
জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার বদলে বিগত আওয়ামী শাসনের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে প্রধান কার্যালয়কে। এর আগে কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের অধীন অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাবের কোয়ালিটি ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ড. লুৎফর রহমান এবং টেকনিক্যাল ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী।
আওয়ামী আমলে এই দুইজন কর্মকর্তা অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাবের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে ল্যাব প্রতিষ্ঠা না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে 'মৃত্তিকা গবেষণা এবং গবেষণা সুবিধা জোরদারকরণ” শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল বারীর সাথে যোগসাজসে অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ওই চক্র।
অনেক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পর থেকেই নষ্ট ও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে যা তদন্ত করলে বের হয়ে আসবে। শুধু যন্ত্রপাতি ক্রয় নয়, ভারতীয় কনসালট্যান্টকে প্রায় ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করারও অভিযোগ উঠেছে। ভারতীয় কনসালটেন্ট কোন রিপোর্ট বা সনদপত্র হস্তান্তর না করা সত্ত্বেও লুৎফর-সিরাজী চক্র পরামর্শক বিল প্রদানের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে।
বিজ্ঞাপন
ড. হুমায়ুন কবির সিরাজীকে ঢাকার বাহিরে বদলির আদেশ জারি হলে দুর্নীতির প্রমাণ নষ্ট করতে ফাইলের মূল কাগজপত্র গায়েব করার মতো গুরুতর অপরাধ করেন, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ। গত বছরের ১৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের সিএসও মো. জয়নাল আবেদিনের স্বাক্ষরিত একটি চিটিতে ৮ টি নথি না পাওয়ায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
নথিপত্র গায়েবের বিষয় নিয়ে ড. হুমায়ুন কবির সিরাজীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি মো. জয়নাল আবেদীনের কাছে এক্রেডিটেশন ল্যাবের সকল নথিপথ বুঝিয়ে দিয়েছি। পক্ষান্তরে মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন পাল্ট্রা অভিযোগ করে বলেন, ড. হুমায়ুন কবির সিরাজীর ফাইলে কোন প্রকার নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলেই তাকে শোকজ করা হয়েছিলো।
ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী একজন আওয়ামী নেতা হিসেবে চাকরি শুরু থেকে টানা ১৮ বছর ঢাকায় পোস্টিং নিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট রূপে কাজ করে পুরস্কার স্বরূপ 'নবসৃষ্ট তিনটি গবেষণাগার জোরদারকরণ কর্মসূচির' প্রকল্প পরিচালক বনে যান।
বিজ্ঞাপন
ওই প্রকল্পের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এত বড় অপরাধ করার পরেও শাস্তি দেওয়ার বদলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে মহাপরিচালক ড. আফসার আলীর বিরুদ্ধে ড. হুমায়ুন কবির সিরাজীকে ঢাকায় এনে সয়েল কেমিস্ট্রি শাখার অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব এবং সয়েল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের এক্রিডিটেশনের নতুন করে দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করার অভিযোগ উঠেছে। কাজ না করেই অর্থ লোপাটের ব্যাপারে তিনি কোন সদুত্তর না দিলেও নিম্নমানের ও অকেজো যন্ত্রপাতির ব্যপারে ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী বলেন, এই সকল যন্ত্রপাতি সবাই ব্যবহার করতে পারেনা বলে ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে আছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নে নিয়োজিত ‘পরিকল্পনা সেল’-কে সুকৌশলে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অলিখিত দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ডিপিসি কমিটিতে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাঈমুল ইসলামকে অপসারণ করে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মামুনুর রহমানকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি গঠন করেছে মহাপরিচালক ড. আফসার আলী। উল্লেখ্য, এর আগে মামুনুর রহমান এই কমিটি থেকে অব্যাহতি নিলেও তাকেই আবার নতুন করে ডিপিসি কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৯ম গ্রেডের পাবলিকেশন অ্যান্ড লিয়াজোঁ অফিসার শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিয়ম বহির্ভূতভাবে একটি বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৭৮৪৬) ব্যবহার করছেন তিনি। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী, 'সহকারী পরিচালক হিসেবে ৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে তাকে উপপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া যাবে।' কিন্তু ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে কোন কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দিয়ে শরিফুল ইসলামকে সম্প্রতি বিধি লঙ্ঘন করে ‘উপপরিচালকের (প্রশাসন)’ রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, শরিফুল ইসলামের পুত্র শাহরিয়ার আরিয়ান নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। গত মে মাসে একটি মামলায় (ডিএমপি মোহাম্মদপুর থানার মামলা নং ৫৮ তারিখ: ১৭/৫/২৬) গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে প্রেরিত হন। অথচ শরিফুল ইসলাম নিজেকে বিএনপি পন্থী দাবি করে মহাপরিচালকের প্রধান আস্থাভাজন হিসেবে সব কমিটির সদস্য সচিব বনে গেছেন।
মহাপরিচালক ড. আফসার আলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সৎ ও বিরোধী মতাদর্শী একাধিক কর্মকর্তার অফিশিয়াল গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ তিনি নিজে ও তার পরিবার সরকারি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৩টি গাড়ি এককভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ঢাকা অফিসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ন্যস্ত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৪র্থ গ্রেডের মো. আমিনুল ইসলামকে অবৈধভাবে ঢাকায় ন্যস্ত করা হয়েছে।
মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিতর্কিত কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদকে। পাশাপাশি কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া ৬৩ জন আউটসোর্সিং কর্মীদের ২ বছর মেয়াদি চুক্তি হঠাৎ বাতিল করা হয়েছে। ফলে একদিকে এই নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে, অন্যদিকে অনেকে কর্মাচারী বেতন না পেয়ে কর্মস্থলে না আসায় এসআরডিআই-এর ল্যাব ও মাঠ জরিপের কাজ অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। মাহমুদুল হাসান নামে এক কর্মচারী বলেন, আমরা যেই কোম্পানীর মাধ্যমে চাকুরী পেয়েছিলাম তার চুক্তি বাতিল হওয়ায় এবং নতুন কোন কোম্পানীর সাথে চুক্তি না হওয়ার ফলে গত ৩ মাস কোন বেতন পাচ্ছিনা। যার ফলে আমাকে বর্তমানে ঋণ করে চলতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ দিকে কৃষিবিদ সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেডের মালিক ফেরদৌস বলেন, ২০২৫ সালের নীতিমালা হিসেবে সাবেক মহাপরিচালক ২ বছরের চুক্তি করেন আমার প্রতিষ্ঠানের সাথে। কিন্তু বর্তমান মহাপরিচালক এসে তা বাতিল করেন। বাতিলের পর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হলেও নতুন করে কোন টেন্ডার আহবান করছেনা। এতে ৬৩ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে বর্তমান মহাপরিচালক নতুন কোন কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই পুরাতন প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল করেছে।
প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একটি আতঙ্ক বিরাজ করছে যে ডিজি আফসার আলী কোন কারন ছাড়াই ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অহেতুক বদলি করছেন। সম্প্রতি ঢাকার বাইরের কর্মকর্তা এবং স্টাফদেরকে দূরবর্তী স্থানে হয়রানিমূলক স্টেশনে বদলি করছেন। তিনি বদলি করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না বিনা কারণে স্ট্যান্ড রিলিজ করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং সুষ্ঠু কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে নন-ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা আপিল করলে (সিপিএলএ ৫০৯৮/২০২৫) মহামান্য আপিল বিভাগ সে মামলাটিও ১৯/০৪/২৬ তারিখে লিভ টু আপিলের আদেশ প্রদান করেন। এছাড়া সিনিয়রিটি নিয়ে ১৯৭৩৫/২০২৫ নং আরও একটি মামলার রুল দেওয়া আছে। বিধায় প্রমোশন দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও ৮ জন নন-ক্যাডার,১২ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে বলে অভিযোগ উঠে।
বিজ্ঞাপন
সামগ্রিক বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. আফসার আলীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি দৈনিক জনবাণী কে বলেন, আউটসোর্সিংয়ের ব্যপারে খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গত ডিজি অবৈধভাবে ২ বছর চুক্তি করায় তা বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী কে ঢাকায় বদলির ব্যপারে প্রশ্ন করলে তিনি আরও বলেন, কাজের প্রয়োজনে তাকে প্রধান কার্যালয়ে আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান চাইলে যে কাউকেই প্রধান কার্যালয়ে আনতে পারে।








