Logo

অপরাধ জগতে ড্রোন ও ক্যাম্পাসে ইয়াবার ছোবল, চরম চ্যালেঞ্জে পুলিশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:০২
অপরাধ জগতে ড্রোন ও ক্যাম্পাসে ইয়াবার ছোবল, চরম চ্যালেঞ্জে পুলিশ
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ কিছু পুরোনো সমস্যার পাশাপাশি নতুন ধরনের ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশের যানবাহন ও অবকাঠামো সংকট, অপরাধীদের ড্রোন ব্যবহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলে ইয়াবার বিস্তার, বিদ্যুৎ সংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ এবং পুলিশের মনোবল—বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে জানানো হয়, পুলিশের অনুমোদিত ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেলের মধ্যে বর্তমানে সচল আছে ৫ হাজার ৫০৩টি। একই সঙ্গে বাহিনীর মোট যানবাহনের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫৮টির বয়স আট বছরের বেশি। ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন বাতিল করা হলেও একই সময়ে নতুন কেনা হয়েছে ২ হাজার ২৪৯টি। ফলে মাঠপর্যায়ে যানবাহনের ঘাটতি এখনো রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি থানায় ডাবল ও সিঙ্গেল কেবিন পিকআপের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকট পূরণে শুধু যানবাহন খাতেই বছরে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। জুলাইয়ের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত থানা, পুলিশ স্থাপনা ও সরঞ্জাম নিয়মিত বাজেটের মাধ্যমে পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয় বলেও বৈঠকে জানানো হয়। এ জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরী জানান, পুলিশের টিঅ্যান্ডই অনুযায়ী বাহিনীতে মোট যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজার ২০০। পুলিশের জন্য ২৭২টি নতুন টহল গাড়ি কেনা হয়েছে, যা আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ১০৭টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও তদন্তকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বৈঠকে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান জেলার অপরাধপ্রবণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অবৈধ বালু উত্তোলনকারী ও অন্যান্য অপরাধীরা ড্রোনের মাধ্যমে পুলিশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করায় অভিযান পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি জেলায় অন্তত দুটি টহল গাড়ি দেওয়ার দাবি জানান।

বিজ্ঞাপন

মাদক নিয়েও বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম চরাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে অভিযান জোরদারের দাবি জানান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ সংস্থাটির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে জানান, নতুন আইনের আলোকে কাঠামো পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক জানান, বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হলেও ব্যাপক চাহিদার কারণে সমস্যাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল বাতেন রাজধানীর পল্লবী, রূপনগর ও মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পগুলোতে মাদক সিন্ডিকেটের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে কাফরুলের আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা এবং গণমাধ্যমে ভুল তথ্য সরবরাহের বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে বেকারত্বকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে রাত জেগে পড়াশোনার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ইয়াবার মতো মাদকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ছাড়াও নীতিগত ও অনুপ্রেরণামূলক বহুমুখী কর্মসূচির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জবাবে আইজিপি জানান, গোপালগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। টানা পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়ে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় পুলিশের ওপর হামলা, থানায় আক্রমণ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও উঠে আসে। সংসদ সদস্যরা বলেন, এসব ঘটনার ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিতর্কিত কর্মকর্তা বা বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্তদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এ ধরনের কর্মকর্তাদের তালিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুল বাতেন বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের পর পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের মানসিক ক্ষত তৈরি হয়েছে। পুলিশের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় বাজেটের বিষয়েও তিনি জানতে চান।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জানান, পুলিশের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে কিছু বাধা তৈরি হলেও দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা বলেন, পুলিশ অনেক সময় কঠিন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও তারা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বিতর্কিত ভূমিকা রাখা বা বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় পদায়নের পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবিও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করা হয়। এ অর্থবছরে মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩২ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ২৮ হাজার ৬৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ২ হাজার ৪৬০ কোটি ২১ লাখ টাকা রাখার কথা বলা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও কমিটির সদস্য মীর শাহে আলম আনসার-ভিডিপি, এনটিএমসি, পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের জন্য পৃথক উন্নয়ন বরাদ্দ এবং দেশের সব জেলায় পাসপোর্ট অফিস থাকার বিষয়টি জানতে চান। একই সঙ্গে তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। তার যুক্তি, সংস্থাটি শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বিভিন্ন অনুমতি ও লাইসেন্স দেওয়ার কাজও করে।

পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. নুরুল হাফিজ জানান, দেশের ৬৪ জেলাতেই পাসপোর্ট অফিস রয়েছে। ঢাকায় থাকা ছয়টি অফিসের মধ্যে দুটি ভাড়া ভবনে এবং বাকি চারটি নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের জনবল নিয়োগ নিয়েও বৈঠকে তথ্য দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ইতোমধ্যে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর আরও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। এছাড়া সরাসরি ২ হাজার এএসআই পদে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও কারা অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সীমান্ত ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলার জট কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতি ৫ হাজার মামলার জন্য অন্তত একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। লঘু অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে ‘অন দ্য স্পট’ মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বাড়ানোর কথা রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সীমান্ত নিরাপত্তায় বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহলে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত করার পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমনে এনটিএমসির আইনি এখতিয়ার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।

চাঁদাবাজির অভিযোগে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে মামলা করতে না চাইলে পুলিশকে বাদী হয়ে মামলা করার সুযোগ দিতে দণ্ডবিধি সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা এবং এসব ক্যামেরার অডিও-ভিডিও রেকর্ড আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য আইনি কাঠামো তৈরির কথাও জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, নতুন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব ও জনবান্ধব আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্র ধারণ করে দায়িত্ব পালনের কথাও বলেন।

বৈঠকে সংসদীয় কমিটির সদস্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, এনটিএমসি এবং পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD