Logo

ফায়ার সার্ভিসে হেলাল সিন্ডিকেটের দাপট

profile picture
বশির হোসেন বাবু
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২:১২
ফায়ার সার্ভিসে হেলাল সিন্ডিকেটের দাপট
মো. হেলাল উদ্দিন খান।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্রয় ও স্টোর ব্যবস্থাপনা ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ।

বিজ্ঞাপন

নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ, অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, সরকারি অর্থের অপচয় এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খানকে ঘিরে। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সদস্যের অভিযোগ, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়, যাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া।

সম্প্রতি ঢাকার সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যলয়ে এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে বলা হয়, ফায়ার সার্ভিসের মতো জীবনরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সরঞ্জামের গুণগত মান যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফায়ার ফাইটারদের অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সম্প্রতি কেনা প্রায় ৩০ হাজার পিস গেঞ্জি। তাদের দাবি, সরবরাহ করা এসব গেঞ্জির কাপড় অত্যন্ত পাতলা ও নিম্নমানের। অনেক গেঞ্জি ব্যবহারের আগেই ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ বিভিন্ন ডিফেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য সাধারণত তুলনামূলক মোটা, টেকসই ও মানসম্মত কাপড়ের পোশাক সরবরাহের প্রচলন রয়েছে।

সদস্যদের প্রশ্ন বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে কেনা ৩০ হাজার গেঞ্জির কাপড়ের মান নির্ধারণ ও গ্রহণের সময় যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই নিম্নমানের গেঞ্জি সরবারহ করা অভিযোগ রয়েছে। শুধু গেঞ্জি নয়, বুটের কালি, ব্রাশসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রীর মান নিয়েও অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। তাদের দাবি, এসব সামগ্রী ব্যবহারের কয়েক দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়।

একই অভিযোগ ইউনিফর্মের কাপড় ও সেলাই নিয়েও। ব্যবহারের অল্প সময়ের মধ্যেই সেলাই খুলে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন মাঠপর্যায়ের সদস্যরা। অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহের ফলে একদিকে সদস্যদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে একই ধরনের পণ্য বারবার কেনার মাধ্যমে সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ যানবাহনের যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয় নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন গাড়িতে নতুন যন্ত্রাংশ লাগানোর পর অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে একই ধরনের যন্ত্রাংশ আবারও কেনার প্রয়োজন হয়। সদস্যদের প্রশ্ন, যন্ত্রাংশের মান, স্থায়িত্ব ও বাজারমূল্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই তা গ্রহণ করা হচ্ছে? নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে সরকারি অর্থ লুটের কারিগর সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ফায়ার ফাইটারদের অভিযোগ, কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা কিছু সামগ্রীর মান তুলনামূলক ভালো হলেও মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জন্য সরবরাহ করা সামগ্রীর মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অসন্তোষ। ক্রয়কৃত সামগ্রীর মান নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে, সে ধরনের একটি পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন স্টেশনের সদস্যদের অভিযোগ, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্টেশনে সরবরাহ করা সামগ্রীর প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করলে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাই করা সম্ভব। তাদের দাবি, কাগজপত্রে পণ্য সরবরাহ ও গ্রহণের হিসাব থাকলেও বাস্তবে সরবরাহকৃত পণ্যের মান, পরিমাণ, স্থায়িত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ফলে শুধু নথিপত্র নয়, সরেজমিন যাচাই, নমুনা পরীক্ষা এবং বাজারদর যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

সূত্র বলছে, অগ্নিকাণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনা ও অন্যান্য উদ্ধার অভিযানে আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তার জন্য ফায়ার স্টেশনগুলোতে ফার্স্ট এইড বক্স, ব্যান্ডেজ, স্ট্রেচার, অক্সিজেন-সংক্রান্ত সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী থাকার কথা। কিন্তু সদস্যদের অভিযোগ, এসব সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অনিয়ম।

কোথাও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নেই, আবার কোথাও কাগজে-কলমে সরবরাহ দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলোর প্রাপ্যতা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জরুরি মুহূর্তে এসব সরঞ্জামের ঘাটতি কিংবা নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারযোগ্য না হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রমে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সদস্যরা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ক্রয়কে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ এবং ভুয়া বিল-ভাউচার প্রস্তুতের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাদের অভিযোগ, ক্রয় ও স্টোর শাখায় বিভিন্ন পণ্য সরবরাহের পর বিল-ভাউচার প্রস্তুত করা হলেও সরবরাহকৃত পণ্যের প্রকৃত মান, পরিমাণ ও বাজারমূল্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। এতে সরকারি অর্থের প্রকৃত ব্যয় এবং নথিতে প্রদর্শিত ব্যয়ের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, ক্রয় ও স্টোর ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সঙ্গে একটি সংশ্লিষ্ট চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং এসব কার্যক্রমে সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খানের নির্দেশনা রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের তুলনাও তদন্তের আওতায় আনা হলে আসল দুর্নীতির চিত্র পাওয়া যাবে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রশ্ন জীবন বাঁচানোর সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও যদি নিম্নমান, অনিয়ম কিংবা অর্থ আত্মসাতের দায় সহকারী পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিনের বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এ ব্যাপারে সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খানের মুঠো ফোনের কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। কিন্তু তার এক প্রতিনিধি যোগ করে বলেন, স্যারের বিরুদ্ধে লিখে লাভ নেই। তার হাত অনেক লম্বা। কারণ তার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারেন নাই। আপনিও বিপদের মধ্যেই আছেন। যে কেনো সময় আপনার উপর হামলা হবে। মার খাবেন, চাকরি হারাবেন। তার চেয়ে ভালো আপনি লেখালেখি বন্ধ করুন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD