ক্ষমতার দম্ভে জনস্বাস্থ্য আউয়ালের পতন

ক্ষমতার দম্ভ, প্রশাসনিক প্রভাববলয়, অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আর গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের চেষ্টার মধ্যেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে সরে যেতে হলো মো. আবদুল আউয়ালকে।
বিজ্ঞাপন
তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, পদায়ন-বদলিতে প্রভাব বিস্তার, আর্থিক লেনদেন এবং সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে দৈনিক জনবাণী ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে মো. জামানুর রহমানকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগের স্তূপে ভারাক্রান্ত সেই প্রশাসনিক অধ্যায়ের অবসান কি এখানেই, নাকি এখন শুরু হবে বহুল আলোচিত অনিয়মের নেপথ্য উন্মোচনের প্রক্রিয়া? আবদুল আউয়ালের অবস্থানকে ক্রমেই বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এরই মধ্যে বদলে গেল অধিদপ্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। বিপুল অর্থের প্রকল্প, টেন্ডার এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রকৌশলীর পদটি প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পদে আবদুল আউয়ালের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর পদায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জ্যেষ্ঠতার প্রচলিত ধারাবাহিকতা অতিক্রম করে তাঁকে শীর্ষ দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাটি অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অসন্তোষের জন্ম দেয়। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জনবাণীতে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞাপন
আবদুল আউয়ালকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি টেন্ডার ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা। অভিযোগকারীদের দাবি, অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া, কাজ বণ্টনে পক্ষপাত এবং বিল-ভাউচার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় ছিল।
এ ছাড়া সরকারি ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পের কার্যাদেশ, নিলাম, পদায়ন ও আর্থিক কার্যক্রম ঘিরেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তিনি অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে এমন এক প্রভাববলয় গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত আনুগত্যও গুরুত্ব পেত।
বিজ্ঞাপন
আবদুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ কোটি টাকা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর আবদুল আউয়ালের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর জনবানীর বিশেষ প্রতিবেদক বশির হোসেন বাবুকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি জনবানীর ডিজিটাল বিভাগের সাংবাদিক জান্নাতুর রহমান পাপ্পার ক্যামেরা ভাঙার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। আরও গুরুতর অভিযোগ, বাংলামোটর এলাকায় সাংবাদিক বশির হোসেন বাবুকে দুটি মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক পথরোধ করে ভয়ভীতি ও হত্যার হুমকি দেয়। পরে আবদুল আউয়ালের পক্ষে আসাদ নামের এক ব্যক্তি ওই সাংবাদিককে মামলা দিয়ে রিমান্ডে নেওয়া এবং নির্যাতনের হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
আবদুল আউয়ালের দায়িত্বকালে সাংবাদিকদের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগও সামনে আসে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র বিপুল অর্থের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, সেখানে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা জনস্বার্থের অংশ। সাংবাদিকদের অভিযোগ, অনিয়মের তথ্য প্রকাশ ঠেকাতেই এমন কঠোরতা দেখানো হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ বা হামলা হলে তা শুধু একজন সংবাদকর্মীর ওপর আক্রমণ নয়; বরং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকারকে সংকুচিত করার শামিল। তিনি অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আবদুল আউয়ালের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাঁকে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এমন দাবিও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
আবদুল আউয়ালের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।








