শুক্রবারেই কেন বারবার নাশকতার ছক, নজরদারি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি নাশকতার ঘটনায় শুক্রবার ও জুমার সময়কে ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর এক সপ্তাহ পর ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুল থানার সামনে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
১৮ সেপ্টেম্বর মালিবাগ, মহাখালী, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ীতে বিস্ফোরণে এক রিকশাচালক আহত হন। একই রাতে কাফরুল থানার সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও তদন্তের কথা জানিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনায় কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত ও আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঘটনার পর মামলা, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও সন্দেহভাজনদের শনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু হলেও আগাম প্রতিরোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পরও পুনরাবৃত্তি
বিজ্ঞাপন
১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুরে গুলশান-৩ এলাকায় কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশ সেখান থেকে দুজনকে আটক করে এবং ককটেল উদ্ধারের কথা জানায়।

ওই ঘটনার পর মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮ সেপ্টেম্বর আবারও রাজধানীর একাধিক স্থানে একই ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
কেন শুক্রবারকে ঘিরে প্রশ্ন
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের সমাগম বাড়ে। ফলে হঠাৎ কয়েকজনের জড়ো হওয়া, মিছিল করা কিংবা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিড়কে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনা নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে আসছে।

তবে শুক্রবারকে বেছে নেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সময়, স্থান ও ধরন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে বিস্ফোরণ ঘটায় ঘটনাগুলো সমন্বিত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা ডিসেম্বরকেন্দ্রিক কর্মসূচির সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
গোয়েন্দা তথ্য কতটা কার্যকর
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো এলাকায় কর্মসূচি হতে পারে—এমন সাধারণ তথ্য থাকলে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সুনির্দিষ্টভাবে কখন, কোথায় এবং কারা জড়ো হবে, সে তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, নজরদারি, চেকপোস্ট ও টহল বাড়ানো সম্ভব হয়।
পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য, ককটেল বিস্ফোরণ বা ঝটিকা মিছিলের মতো ঘটনা ঘটাতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। জুমার সময় বিপুল মানুষের ভিড়ে জড়িতদের আলাদা করাও কঠিন। তবে ১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নাকি সমন্বিত, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

আরেক কর্মকর্তা বলেন, একই সময়ে রাজধানীর একাধিক এলাকায় ছোট ছোট ঘটনা ঘটলে প্রতিটি স্থানে সমানসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা বাস্তবসম্মত নয়। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাড়তি ফোর্স পাঠানো সম্ভব।
ডিএমপির নিরাপত্তা জোরদার
১৮ সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের পর রাজধানীতে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২০০টিরও বেশি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার ও প্রবেশপথে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চলাচলের ওপরও নজরদারি রাখা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, নিষিদ্ধঘোষিত কোনো দলের অপতৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে নজরদারি আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
আগাম প্রতিরোধই বড় চ্যালেঞ্জ
বিজ্ঞাপন
ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আগাম প্রতিরোধকে বেশি কার্যকর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ জন্য সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তথ্য দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলোতে পুলিশ বক্স ও থানার কাছাকাছি এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ফলে শুধু দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সময় আগে থেকে চিহ্নিত করা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।








