ডিপিডিসি’র বিদ্যুৎ চুরি করে কোটিপতি প্রকৌশলী জাহাঙ্গির

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর সিদ্দিরগঞ্জ ডিভিশনে বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চললেও বেশির ভাগ সময়ই তা ধরা পড়ে না। মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও শাস্তি হয় না জড়িতদের।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, সিদ্দিরগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান (পরিচিতি নং ১১১৩০) ম্যানেজ করেই চলছে অবৈধ সংযোগ বানিজ্য। খোদ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ জাহাঙ্গির হোসেন (পরিচিতি নং ২০৩৬৪) বিদ্যুৎ চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপত্তিতে পড়েছেন নিরাপত্তাকর্মীসহ অনেকেই। এই ডিভিশনে প্রতিদিন বিদ্যুৎ চুরির দুই লাখ টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে আয় প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের পকেটে কোটি টাকা।
অভিযোগ সূত্র বলছে, ঘুষ, অবৈধ সংযোগ ও বিল জালিয়াতিরসহ নতুন সংযোগ নিতে জাহাঙ্গীর সিন্ডিকেটের সঙ্গে চুক্তি করতে হয় গ্রাহকদের। তাছাড়া ৫০ কিলো লোডের বেশি সংযোগ নিতে নির্বাহী প্রকৌশলীর ম্যানেজ মাস্টার প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর। তাই গ্রাহক সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বিদ্যুৎ সংযোগ মেলে না। জাহাঙ্গীরই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাস্টার।
প্রতিদিন বিভিন্ন বাহানায় গ্রাহকের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করেন এই চক্র। সূত্র বলছে, সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনে গ্রাহকের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে বেশি সুবিধা দেন একটি চক্র। প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের একটি চক্র শতাধিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ মিটারে নানা কৌশলে টেকনিক্যাল চুরি করেন। এতে করে সরকার হারাচ্ছেন রাজস্ব। গত শনিবার সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের সরোজমিন ঘুরে দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার পাইনাদি নতুন মহল্লা এলাকার এক বিদ্যুৎ গ্রাহকের নাম সংশোধনের আবেদন এবং সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিলের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহক মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর পিতা মরহুম আবদুর রাজ্জাক। স্থায়ী ঠিকানা আর/এস-৪৮৮, পাইনাদি, নতুন মহল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সংযোগের মিটার নম্বর ডি এইচ কে এম-৬৮৪৫ এটা একটি পোস্টপেইড মিটার। সংযোগটি বর্তমানে এলটি-ই (বাণিজ্যিক ও অফিস) ট্যারিফের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, জুন-২০২৬ মাসের বিদ্যুৎ বিলের তথ্য অনুযায়ী, বিল নম্বর ১১০৪৬৫১৬৭৪ এবং গ্রাহক নম্বর ৩৮২৬৬১৫১।
মিটার রিডিং বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫ মে ২০২৬ তারিখে মিটারের পূর্ববর্তী রিডিং ছিল ৯৩,৫৯৬ ইউনিট। পরবর্তী রিডিং নেওয়া হয় ৩০ জুন ২০২৬, যেখানে রিডিং দাঁড়ায় ৯৭,৫১৭ ইউনিট। ফলে এক মাসে মোট ৩,৯২১ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার রেকর্ড হয়েছে। এছাড়া বিলে ৫০৯ ইউনিট সমন্বিত ইউনিট হিসেবেও উল্লেখ রয়েছে। গ্রাহকের নথি ধরে সরোজমিনে দেখা গেছে, গ্রাহক মো. মোশাররফ হোসেন এই বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই ৮০/১২০টি অটো রিকশা চার্জ দিয়ে যাচ্ছেন। খবর পেয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন হঠাৎ করে রিকশার গ্যারেজে হাজির হয়ে গ্রাহককে ২০ লাখ টাকা জরিমানার ভয় দেখান। পরে গ্রাহক সমাধানের চুক্তিতে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেনকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দেন। নাম মাত্র জরিমানা করে সমাধান করে দিবে বলে চুক্তিবদ্ধ হন।
এ বিষয় গ্রাহক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, নিয়মিত বিদ্যুৎ কর্মীদের ঘুষ দিয়ে এই সংযোগ সচল রেখেছি। আগে দিতাম লাইনম্যানকে এখন দিচ্ছি উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন স্যারকে। আপনি এই বিষয়ে কিছু করবেন না। আমার ক্ষতি হবে। ইতিমধ্যে জাহাঙ্গীর স্যারকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছি। হয়তো খুব শিগগিরই ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবেন জাহাঙ্গীর স্যার।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। ঘুষের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমরা টাকা দিলে একা খেতে পারি না। নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারকে দিতে হয়। যা ইচ্ছে তাই লিখেন। বড় স্যারদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। আমার কিছু হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, সরাসরি বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই উপ-সহকারী প্রকৌশলী। এদের পরোক্ষ সহায়তা করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। কেউ এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। বিশেষ করে বেশ কিছু চুক্তিভিত্তিক মিটারম্যানরা নানা রকম ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।








