চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে রূপপুর, কবে মিলবে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ?

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। প্রথম ইউনিটের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মিললেই কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ১২ মে প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজনের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। এসব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজন বিক্রিয়া শুরু করা হবে। ওই বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ থেকে বাষ্প তৈরি হবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এই ধাপ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ৩৩তম দেশে পরিণত হবে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাস্তবে সেই সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে প্রতিটি নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয় এবং কোনো ধাপে ত্রুটি ধরা পড়লে তা সংশোধনের পরই পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, প্রথম ধাপে নির্ধারিত ২ হাজার ৪৬টি পরীক্ষা এবং দ্বিতীয় ধাপের ৯০টি পরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের শেষ অংশে আরও ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাকি রয়েছে। এগুলো সফলভাবে শেষ হলে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এরপরও প্রায় সাত থেকে আট মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও পর্যবেক্ষণ চলতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
বিজ্ঞাপন
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই এগোতে হয়। প্রতিটি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণের পর প্রয়োজন হলে সংশোধন করে পরবর্তী ধাপে যাওয়া হয়। ফলে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ আগে থেকেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। সব তথ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের অনুমোদনের পরই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন এই প্রকল্প দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক বিদ্যুৎ প্রকল্প। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এনপিসিবিএল। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট দুটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট নির্মাণ করছে। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দিন-রাত সমানভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রতিটি ইউনিটে প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন জ্বালানি সংযোজন করতে হবে। জ্বালানি পরিবর্তন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কার্যক্রম মিলিয়ে একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাসের জন্য বন্ধ থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও বিশেষ নিরাপত্তার আওতায় রাখা হবে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের জন্য রাশিয়ায় পাঠানো হবে। তবে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবহৃত জ্বালানি বের করার পর তা সঙ্গে সঙ্গে পাঠানো হয় না। নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতল করার জন্য প্রয়োজন হলে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত রূপপুরেই রাখা যাবে। এরপর পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় চূড়ান্ত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে প্রকল্পের ব্যয়ও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ নেই, ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
কর্মকর্তাদের মতে, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈদেশিক লেনদেনের জটিলতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিলম্ব, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত এবং ডলার সংকটের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরের একটি ইউনিট চালু হলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই সম্ভাব্য সাশ্রয়ও কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও পারমাণবিক জ্বালানির খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য অন্যান্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক থাকবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। পাওয়ার গ্রিড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য গ্রিড প্রস্তুত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পিনিং রিজার্ভ বা জরুরি বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ কোনো কারণে রূপপুর থেকে উৎপাদন হঠাৎ বন্ধ হলে বিকল্প কেন্দ্রগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে সক্ষম থাকতে হবে, যাতে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় না ঘটে।
বিজ্ঞাপন
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ফলে শুরুতেই স্পিনিং রিজার্ভ নিয়ে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এদিকে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর দিন রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সরকারপ্রধান ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পারমাণবিক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড শতভাগ নিশ্চিত করা। কোনো ধরনের তাড়াহুড়া না করে প্রতিটি পরীক্ষা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা দেরি হলেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই রূপপুর থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা উচিত বলে তারা মনে করেন।








