Logo

কেন ৭ মাসেই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়েছিল বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:০৮
কেন ৭ মাসেই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়েছিল বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হিসেবে ২০০১ সালে দল ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হলেও দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। দলীয় সংসদ সদস্যদের অনাস্থা, একাধিক রাজনৈতিক অভিযোগ এবং সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তাঁর বিদায়ের পথ তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও তাঁর অবস্থান নিয়ে দলীয় অন্দরমহলে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয় ২০০২ সালের জুন মাসে, যখন বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা শুরু হয়।

দলীয় সূত্রে সে সময় প্রধান অভিযোগ ছিল, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে না যাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করা। বিএনপির অনেক সংসদ সদস্য এসব বিষয়কে দলীয় আদর্শের পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরেন এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ছেলে ও বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরীর উদ্যোগে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সফর উপলক্ষে তোরণ নির্মাণ নিয়েও দলীয় নেতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিষয়টি সংসদীয় দলের বৈঠকে আলোচনায় আসে এবং রাষ্ট্রপতির পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বিজ্ঞাপন

এসব অভিযোগের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিষয় সামনে আনা হয়। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান ব্যবহার না করা, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগসংক্রান্ত একটি ফাইলে স্বাক্ষর না করা, বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্তে আপত্তি তোলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে অতিরিক্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন—এসব নিয়েও দলীয় মহলে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি বেশি হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর শেষে তাঁর খোঁজ না নেওয়া, নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণকেও বিএনপির একটি অংশ নেতিবাচকভাবে দেখেছিল। অনেকের অভিযোগ ছিল, দলীয় মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করছিলেন।

১৯ ও ২০ জুন অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে অধিকাংশ সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জানান। পরে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন চিফ হুইপের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে রাষ্ট্রপতির প্রতি পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে অনেকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) কথাও উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার সময় রাষ্ট্রপতির ছেলে মাহী বি. চৌধুরী বৈঠকের পরিস্থিতি সম্পর্কে বাবাকে অবহিত করে পদত্যাগের পরামর্শ দেন বলেও সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এরপর রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অবশেষে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান বদরুদ্দোজা চৌধুরী। পদত্যাগের পর তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সংবিধানসম্মত ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, তিনি দলীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেননি এবং রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই দলীয় পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি দল নয়, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও বদরুদ্দোজা চৌধুরী একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করাই ছিল তাঁর কর্তব্য এবং সেটিই তিনি করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদে থাকাকালে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দলীয় প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণের কারণে শেষ পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরেই তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় মাত্র সাত মাস সাত দিনের মধ্যেই তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD