তেল-গ্যাস-বিদ্যুতে চাপে মধ্যবিত্ত, বাড়ছে বিকল্প খরচের বোঝা

‘এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়বে। গত দুই-তিন মাস ধরে বিদ্যুতের বিলও বেশি আসছে। তিতাস গ্যাসের বিল নিয়মিত পরিশোধ করলেও লাইনে গ্যাস থাকে না। নিরুপায় হয়ে বৈদ্যুতিক ওভেন কিনেছি। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় সেটিতেও রান্না করা যায় না। তখন সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হয়।’
বিজ্ঞাপন
পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা মীর আনোয়ার হোসেনের কথায় উঠে এসেছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের চিত্র। রান্নার গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ, ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি থেকে বাজার খরচ—বিভিন্ন দিক থেকেই বাড়ছে মাসিক ব্যয়ের চাপ।
মীর আনোয়ার হোসেন জানান, গাড়িচালককে অনেক সময় বসিয়ে রেখেও বেতন দিতে হচ্ছে। কারণ গাড়িতে গ্যাস নিতে তিন-চার ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে তিনি ১১৫ টাকা লিটার দরে ডিজেল কিনে গাড়ি চালিয়েছেন। এখন সেই ডিজেলের দামও লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিজে বাড়ির মালিক হয়েও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষের ওপর এই চাপ আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
গত কয়েক মাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের পাশাপাশি চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, দুধ, মাছ, ফলমূল ও সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে এর প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পর বাজারে আরও পণ্যমূল্য বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এক বছরে তিন দফা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা।
চলতি বছরে এটি জ্বালানি তেলের তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা করা হয়।
বিজ্ঞাপন
পরে জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।
মার্চের তুলনায় সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ দরে ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা বেড়েছে।
বিল দিয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাস
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাস-সংকটও নগরজীবনে বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করেছে। নিম্নচাপের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবারকে বৈদ্যুতিক চুলা, ওভেন কিংবা এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাসের চাপ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
লোডশেডিংয়ে বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির খরচ
বিজ্ঞাপন
গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ ওঠে। ১২ আগস্ট জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিছু এলাকায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও পাওয়া যায়।
ফলে গ্যাস না থাকলে এলপিজি এবং বিদ্যুৎ না থাকলে অন্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। এতে একটি সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে আরেকটি খাতে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।
পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খাতে দ্রুত এর প্রভাব পড়ে। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রাকের ট্রিপপ্রতি ভাড়া প্রায় ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়। ছোট ও মাঝারি পিকআপের ভাড়াও প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ার কথা জানা যায়।
এবার ডিজেলের দাম আরও ২০ টাকা বাড়ায় একই অনুপাতে হিসাব করলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রিপপ্রতি প্রায় ৯ হাজার ৩০০ থেকে ১৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হওয়ার সম্ভাব্য হিসাব পাওয়া যায়। তবে এটি কোনো নির্ধারিত নতুন ভাড়া নয়। কারণ পরিবহনভাড়া নির্ধারণে জ্বালানির পাশাপাশি গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের মজুরি, টোল, যানজট ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় আসে।
নরসিংদী এলাকার লঞ্চমালিক আবু হানিফ জানান, তার দুটি লঞ্চে প্রতিদিন প্রায় ১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু ডিজেলের পেছনেই তার দৈনিক অতিরিক্ত ২ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হবে। তবে লঞ্চভাড়া বাড়ানোর কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর জিগাতলার বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, তিতাসের লাইনে গ্যাস না থাকায় তিনি বাসায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা হলেও সরবরাহ সংকটের কথা বলে বিক্রেতা তার কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আবদুল কাদের বলেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট হচ্ছে—সরকার তা স্বীকার করলেও এতে ভোক্তাদের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হচ্ছে না।
এক খরচ সামলাতে গিয়ে বাড়ছে আরেক খরচ
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যয়ে। পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরাসরি জ্বালানি ব্যবহার করে না এমন পরিবারও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়। পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারদরের মাধ্যমে সেই বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে উৎপাদন ও পরিবহন—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকারের ব্যাখ্যা
সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান এবং জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সরকারের হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারদরের ভিত্তিতে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ালে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজার ও বিপিসির আর্থিক চাপ মোকাবিলার এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সরাসরি পড়ছে পরিবারগুলোর ব্যয়ে। রান্নার জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন এবং বাজারের নিত্যপণ্য—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের হিসাব করতে হচ্ছে।
আয় একই হারে না বাড়লেও জীবনযাপনের ব্যয় বাড়তে থাকায় মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে চাপ আরও বাড়ছে। গ্যাসের সংকটে সিলিন্ডার, বিদ্যুতের ঘাটতিতে বিকল্প ব্যবস্থা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয়—তিন দিকের এই বাড়তি খরচ এখন পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।








