Logo

আশ্রয়ণের ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন কেন ভূমি ও গৃহহীনরা?

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
চাঁদপুর
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৯:০৫
আশ্রয়ণের ঘর ছেড়ে যাচ্ছেন কেন ভূমি ও গৃহহীনরা?
ছবি: সংগৃহীত

চাঁদপুরে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘর এখন ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও অল্পসংখ্যক পরিবার বসবাস করলেও অধিকাংশ ঘর তালাবদ্ধ। কর্মসংস্থানের সংকট, পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ঘাটতি এবং ঘরগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে অনেক সুবিধাভোগী প্রকল্প ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৪ হাজার ১৭৩টি পরিবারের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মুজিববর্ষ উপলক্ষে সর্বশেষ ১১৫টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব ঘরের মধ্যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় ৪০টি, মতলব দক্ষিণে ২৫টি, মতলব উত্তরে ৫টি, শাহরাস্তিতে ১৫টি, হাজীগঞ্জে ৫টি এবং হাইমচরে ২০টি রয়েছে।

এ ছাড়া মতলব দক্ষিণ উপজেলার চর পাথালিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২৭টি ব্যারাকে বসবাসকারী ১৩৫টি পরিবারের মধ্যে ৪৫টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আরও ৪৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এসবসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে মোট ১৬০টি ঘর নির্মাণ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে বরাদ্দের এক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা কমতে শুরু করে। কোনো কোনো এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার থাকলেও অধিকাংশ ঘরই খালি পড়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হামানকদ্দীতে ৪০ ঘরে থাকছেন ১০-১২ পরিবার

চাঁদপুর সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়নের হামানকদ্দী আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২০২১ সালে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ৪০টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক বছরের মধ্যেই অধিকাংশ পরিবার সেখান থেকে চলে যায়। বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২টি পরিবার সেখানে বসবাস করছে।

বাসিন্দারা জানান, ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পরও সেখানে থেকে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাছাকাছি কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা। পাশাপাশি কয়েকটি ঘরের বিভিন্ন অংশও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব কারণে অনেক পরিবার অন্যত্র চলে গেছে।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও মতলব উত্তরের চরাঞ্চলের কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, নদী ও চরাঞ্চলে নির্মিত প্রকল্পগুলোতে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক সুবিধাভোগী সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারছেন না।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু একটি পরিবারকে মাথা গোঁজার জায়গা দেওয়া নয়; বরং ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা। কিন্তু অনেক প্রকল্পে ঘর নির্মাণের পর পানি, বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় সুবিধাভোগীদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জীবিকার প্রয়োজনে অনেকে প্রকল্প থেকে দূরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর খালি পড়ে থাকছে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কোনো এলাকায় সুবিধাভোগীদের ঘর অন্যের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যদিও সরকারি বরাদ্দের এসব ঘর বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।

হামানকদ্দী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা পাখি বেগম বলেন, ‘আমাদেরকে ঘর দেওয়ার পর থেকে একদিনও কেউ খোঁজখবর রাখেনি। এক বছরের মধ্যে ঘরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে পানি পড়ে। ঘরের দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। ঘরের সামনে বৃষ্টির পানি জমে, সাপ আসে।’

আরেক বাসিন্দা হোসনে আরা বলেন, ‘থাকার জন্য শেখ হাসিনা ঘর দিসে। এখানে আইসা খুশি হইছিলাম কিন্তু কয়েক দিন পর আর সেই খুশি গেছে গিয়া। যেখানে থাকতে দিসে, সেখান থেকে দোকান বাজার অনেক দূরে। আমার স্বামী কাজ পায় না। এখানে যারা থাকে অসুস্থ হয়ে যায়। তাই সবাই তালা মেরে বিভিন্ন যায়গায় চলে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

পারভিন বেগম বলেন, ‘তিন বছর ধরে কষ্ট করে এখানে থাকি কিন্তু কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাই না। আগে ৪০টি পরিবার ছিল কিন্তু এখন ১০-১২টি পরিবার আছে। এখানে বসবাস করার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ঘরের অবস্থা খুব খরাপ। বাইরে থেকে সুন্দর লাগলেও ভেতরে খারাপ অবস্থা। যে কারণে বাধ্য হয়ে এখান থেকে সবাই চলে যাচ্ছে। আমরা তারেক রহমান সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমাদের যাতে খোঁজখবর রাখে এবং সহযোগিতা করে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেন, ‘শুধু ঘর নির্মাণ করে দিলেই ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত হয় না। আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, যোগাযোগব্যবস্থা, পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত না করায় অনেক সুবিধাভোগী বাধ্য হয়ে আশ্রয়ণের ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। সরকারি অর্থে নির্মিত ঘর যাতে পরিত্যক্ত না হয়, সেজন্য প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম ও ঘর বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

চাঁদপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পের কিছু ঘর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেক সুবিধাভোগী সেখানে বসবাস করছেন না। বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে একটি তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। যেসব ঘর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ যদি সেখানে বসবাস না করেন, তাহলে যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকার মাধ্যমে প্রকৃত ছিন্নমূল ও ভূমিহীন মানুষদের ওই ঘরগুলোতে বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে।’

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD