মাত্র এক মিনিটের ঝড়ে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি তছনছ

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে মাত্র এক মিনিটের আকস্মিক ঝড়ে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপড়ে পড়েছে গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরের টিনের চালা, দোকান, বিদ্যালয় ও সবজি ক্ষেত। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ঝড়ের পর থেকে দুর্ভোগে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের পশ্চিম পাবিয়াজুরী ও গোরকপুর এলাকায় হঠাৎ তীব্র ঝড় শুরু হয়। ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাত ও বৃষ্টিও হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবল বাতাসে বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় গাছ উপড়ে পড়ে এবং ঘরবাড়ির টিনের চালা উড়ে যায়।
ঝড়ে সড়কের ওপর গাছ পড়ে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পাশের জেলা শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান ও মাথাফাটা এলাকাতেও পড়ে।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ভোরে হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর পর ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। মাত্র এক মিনিটের তীব্র দমকা বাতাসে পশ্চিম পাবিয়াজুরী ও গোরকপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঝড়ের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ঝড়ে গোরকপুর উত্তরপাড়ার বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের বসতঘর ও রান্নাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘরের টিনের চালা উড়ে গিয়ে প্রায় ১০০ গজ দূরে পড়ে। রবিবার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের বিভিন্ন অংশ ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল টিন ও কাঠের খুঁটি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানের মাচাও।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এক চোখে দেখতে পাই না। অটোরিকশা চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে ভিটায় নতুন ঘর করেছিলাম। কিন্তু মাত্র এক মিনিটের ঝড়ে আমার সব শেষ হয়ে গেল। ঘরের একটি চালা উড়ে গিয়ে প্রায় ১০০ গজ দূরে পড়ে আছে। বিদ্যুতের মিটারটি এখনও খুঁজে পাইনি।’
গোরকপুর এলাকার বিধবা রাহিলার ঘরও ঝড়ে ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী নেই। অনেক কষ্টে দিন কাটে। ঝড়ে আমার ঘরটাও ভেঙে গেছে। আমার একটা ব্যবস্থা করে দেন।’
বিজ্ঞাপন
পশ্চিম পাবিয়াজুরী এলাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরে থাকা অবস্থায় ঝড়ের কবলে পড়েন রুবেল। তার ঘরের চালা উড়ে যাওয়ার সময় ভেঙে পড়া খুঁটির নিচে চাপা পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন। তার স্ত্রী রেনুয়ারা জানান, রুবেলকে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
গোরকপুর বাজারে হেলাল উদ্দিনের দোকানও ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। পশ্চিম পাবিয়াজুরীর বাসিন্দা আজি রহমানের বসতঘর ও গোয়ালঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ঘরের চারটি চালা নষ্ট হয়েছে। এ ঘটনায় তার দুই ছেলে আহত হয়েছেন। গোয়ালঘরে থাকা একটি গরুর পা কেটে গেছে।
ঝড়ে গোরকপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভোরের ঝড়ে বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি গাছ ভেঙে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া স্থানীয় সবজি ক্ষেতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছপালা সরিয়ে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা।
গোরকপুর এলাকায় তিনটি ট্রান্সফরমার ও কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা।
ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মোস্তফা কামাল বলেন, দুই গ্রামে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। তিনি বলেন, ‘মুহূর্তের মধ্যেই অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, গাছ উপড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। আমরা দ্রুত প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’
বিজ্ঞাপন
ঝড়ের খবর পাওয়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলের নির্দেশে একটি প্রতিনিধি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যায়। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি দেখেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
প্রতিনিধি দলের সদস্য ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সংসদ সদস্য সালমান ওমর রুবেলের নির্দেশে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সরেজমিনে দেখেছি। যাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এমপি সালমান ওমর রুবেল ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যেন দ্রুত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সময়েও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
বিজ্ঞাপন
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও প্রকৃত অবস্থা জানতে উপজেলা প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য এলাকা ও পরিবারের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’








