ডিজেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়ায় ফের বড় ঝটকা!

দেশের বাজারে ডিজেলসহ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন দরে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দূরপাল্লার বাসের পরিচালন ব্যয়ে। পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ৪৫ আসনের একটি বাস প্রতি লিটার ডিজেলে গড়ে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার চললে আগে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ হতো প্রায় ৩২ টাকা ৮৬ পয়সা। নতুন দরে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ টাকা ৫৭ পয়সায়।
অর্থাৎ, প্রতি কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের পেছনেই খরচ বেড়েছে প্রায় ৫ টাকা ৭১ পয়সা। ফলে ১০০ কিলোমিটার যাত্রায় আগে যেখানে জ্বালানি খরচ ছিল প্রায় ৩ হাজার ২৮৬ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮৫৭ টাকা। এতে ১০০ কিলোমিটারে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ৫৭১ টাকা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী থেকে ঘোড়াঘাট হয়ে পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৩৮ কিলোমিটার। এই রুটে একটি বাসের যাওয়া-আসায় ২৫০ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন হয়। ২৫০ লিটার ধরে হিসাব করলে আগে জ্বালানি খরচ ছিল ২৮ হাজার ৭৫০ টাকা। নতুন দরে একই পরিমাণ ডিজেলের জন্য খরচ হচ্ছে ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ এক ট্রিপে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গড়ে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করলে অতিরিক্ত এই জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব পড়ে জনপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা। কোনো বাস মাসে ২৫ দিন চলাচল করলে শুধু ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দূরপাল্লার বাস মালিক জানান, তারাকান্দি রুটে একটি বাসে গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ লিটার ডিজেল লাগে। নতুন দরে শুধু ওই ট্রিপেই অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। এর সঙ্গে পূর্বাচল হয়ে টার্মিনালে আসা-যাওয়ার জ্বালানি ব্যয় যোগ করলে গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত খরচ প্রায় ৩ হাজার টাকা হতে পারে।
তার ভাষ্য, ৪৫ আসনের বাসে গড়ে ৩০ জন যাত্রী থাকলে জনপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়তি ভাড়া আদায় করেও ট্রিপে অতিরিক্ত আয় হবে ১ হাজার ২০০ টাকা, যা বাড়তি জ্বালানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগেই ভাড়া ৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন নতুন করে আবারও ৫০ টাকা বাড়ালে যাত্রীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। বেশি ভাড়ার ভয়ে যাত্রীরা লোকাল বাসে ঝুঁকে পড়তে পারেন, যদিও লোকাল বাসের ভাড়াও ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় পৌঁছে গেছে। এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম না বাড়িয়ে দুই-চার টাকা করে বাড়ালে পরিবহন মালিকরা সমন্বয় করতে পারতেন। মানুষের আয় না বাড়ায় ভাড়ার পুরো চাপ যাত্রীদের ওপর চাপানোও অবাস্তব।’
মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাস মালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় বাসভাড়া নতুন করে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ১০০ কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের পেছনে অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা খরচ পরিবহন মালিকদের চাপে ফেলেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আলোচনা করছে এবং মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
লোকাল বাসের ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম ভাড়া নেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে নির্ধারিত ভাড়া ৩৩০ টাকা হলেও লোকাল বাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। অথচ ময়মনসিংহ যেতে দূরপাল্লার বাসের কাছাকাছি পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ায় লোকাল বাসগুলোও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ডলারের দাম ৮৬ টাকা ৩১ পয়সা থাকা সময়ের হিসাব ধরে বাসভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ডলারের দাম ১২৬ টাকা পর্যন্ত উঠলেও ভাড়ার অন্যান্য উপাদানের ব্যয় সমন্বয় করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তার মতে, নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ায় ছোট বাস মালিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত বাসভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছে পরিবহন মালিকদের সংগঠনটি।
এদিকে ডিজেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়েছেন যাত্রীরা। আশিকুর রহমান নামে এক বাসযাত্রী বলেন, তেলের দাম বাড়লেই মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান, কিন্তু তেলের দাম কমলে ভাড়া কমানোর উদ্যোগ দেখা যায় না। মানুষের আয় রাতারাতি বাড়েনি, তাই বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পুরো চাপ যাত্রীদের ওপর দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
রাকিবুল ইসলাম নামে আরেক যাত্রী বলেন, ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের বাসভাড়া আগে ছিল ৩৫০ টাকা। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার পর ভাড়া করা হয় ৪০০ টাকা। চার মাসের মধ্যে আবার ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করা হলে সাধারণ মানুষের জন্য তা বহন করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।








