শিশুদের অনলাইন পর্নোগ্রাফির ঝুঁকি, সুরক্ষায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

ইন্টারনেট শিশু-কিশোরদের শিক্ষা, বিনোদন ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার আড়ালেই তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের ঝুঁকি। বিশেষ করে অল্প বয়সে পর্নোগ্রাফি ও অনুপযুক্ত যৌন কনটেন্টের সংস্পর্শ শিশুদের মানসিক বিকাশ, যৌনতা সম্পর্কে ধারণা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অজান্তেই শিশুরা এসব কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, অল্প বয়সে পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। পাশাপাশি যৌনতা, লিঙ্গ, সম্মতি ও সম্পর্ক সম্পর্কে তাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষায় প্রচলিত ব্যবস্থাগুলো তাল মেলাতে পারছে না। তাই শুধু ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, শিশুদের সমালোচনামূলক চিন্তা ও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শিশুদের অনলাইন যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি
ইউনিসেফের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ‘থ্রেট চিলড্রেনস আইজ’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, এক বছরে আনুমানিক ২ কোটি ১২-১৭ বছর বয়সী শিশু প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। একই সময়ে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন কনটেন্ট দেখেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে উদ্বেগের বিষয় শুধু নির্যাতনের সংখ্যা নয়, এসব ঘটনার অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে অপ্রকাশিত। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার এক শতাংশেরও কম পুলিশ, সমাজকর্মী কিংবা হেল্পলাইনে জানানো হয়েছে। ১০ জনের মধ্যে চারজনেরও বেশি শিশু তাদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানায়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়, সামাজিক লজ্জা, অপরাধবোধ এবং অভিভাবকদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা শিশুদের নীরব থাকার অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই কোনো শিশু অনুপযুক্ত যৌন কনটেন্টের সংস্পর্শে এলে তাকে দোষারোপ বা অপমান করা উচিত নয়। বরং তার সঙ্গে বিচারহীন পরিবেশে কথা বলা, বয়সোপযোগী শিক্ষা দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা পেশাদারের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশু সুরক্ষায় পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব
বিজ্ঞাপন
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের শিশু অধিকারবিষয়ক কমিটির জেনারেল কমেন্ট নম্বর ২৫-এ বলা হয়েছে, ডিজিটাল পরিবেশে শিশুদের সুরক্ষা জাতীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে অনলাইনে যৌন শোষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধের পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুদের শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিলে চলবে না। তাদের শেখাতে হবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা, অনলাইন হয়রানি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করার কৌশল। একই সঙ্গে অনলাইনে কেউ ভয় দেখালে, ব্যক্তিগত ছবি চাইলে কিংবা ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করলে কোথায় এবং কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে, সে বিষয়েও সচেতন করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাড়ছে নতুন ধরনের হুমকি
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ছবি ও ভিডিও তৈরির সহজলভ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার করে শিশুদের ছবি বিকৃত করা, ভুয়া যৌন নিপীড়নমূলক দৃশ্য তৈরি এবং সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করার ঝুঁকি বাড়ছে।
উই প্রোটেক্ট গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের ‘গ্লোবাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিশু যৌন শোষণ ও নির্যাতনের ধরন এবং কৌশল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এআই-নির্মিত যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, ডিপফেক, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগমাধ্যম এবং যৌন ব্ল্যাকমেইল শিশু সুরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে ইউনিসেফের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর গবেষণাতেও এআইনির্ভর ছবি ও ভিডিও তৈরির প্রযুক্তির কারণে শিশুদের যৌন শোষণ ও নির্যাতনের নতুন ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও বাড়ছে। শিশুদের বয়স ও ঝুঁকি বিবেচনায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা, অনুপযুক্ত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের নিজেরাই সব বিপদ সামলে নেবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের আইন ও বাস্তব পরিস্থিতি
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশেও শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ২৮১ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়স হওয়ার আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছে। জরিপে ক্ষতিকর কনটেন্ট, যৌন হয়রানি ও সাইবার নিপীড়নের ঝুঁকির বিষয়ও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, দেশে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত কাঠামোও হালনাগাদ করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তালিকায় ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন রয়েছে। এই আইনের ২৫ ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত উপাদান এবং সেক্সটর্শনের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে বিধান রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অভিযোগ পাওয়ার পর কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে কি না এবং ভুক্তভোগী শিশুরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে অনলাইনে নির্যাতনের শিকার শিশুদের পরিচয়, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। অভিযোগ জানানোর কারণে যেন কোনো শিশু নতুন করে সামাজিক অপমান বা হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, প্রয়োজন নিরাপদ ব্যবহারের শিক্ষা
শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি থেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়। বরং নিরাপদভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করা। কারণ শিক্ষা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রাপ্তি ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ জন্য পরিবারে শিশুদের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। অভিভাবকদের উচিত বয়স অনুযায়ী ডিভাইস ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সেটিংস চালু রাখা এবং শিশুর অনলাইন অভিজ্ঞতার বিষয়ে আগ্রহ দেখানো। তবে নজরদারির নামে ভয় বা শাস্তির পরিবেশ তৈরি করলে শিশুরা বিপদের কথা গোপন করতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন সচেতনতা বিষয়ে নিয়মিত পাঠদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের সহায়তার কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শিশুর হাতে প্রযুক্তি পৌঁছেছে, কিন্তু নিরাপদ ব্যবহারের শিক্ষা কি পৌঁছেছে? পর্নোগ্রাফি ও ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতে শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারে আস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ। শিশুদের শুধু পর্দা থেকে দূরে রাখলে হবে না, পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদ চিনে নিরাপদ থাকার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।








