ডিপিডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী রউফের ভুলের বলি বিদ্যুৎকর্মী

রাজধানীর ডেমরায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ডিপিডিসির আউটসোর্সিং (ডিএসএস) বিদ্যুৎ শ্রমিক মো. আনিছ (৩৫)। গত রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে মেন্দিপুর থুলথুলিয়া এলাকায় বিদ্যুতের থ্রি-ফেজ প্রিপেইড মিটারে কাজ করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে। জীবন বাঁচাতে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে লাফ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় থানা-পুলিশকে অবহিত না করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ডিপিডিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী, ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান (১১১৭২) এবং ডেমরার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফের (১১৩৪২) বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, নিহত কর্মী মো. আনিছ ডেমরার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফকে অনুরোধ করেছিলেন, ‘স্যার, আমি মিটার লাগাতে পারি না। দয়া করে আমাকে দিয়ে এই কাজ করাবেন না।’ কিন্তু এরপরও তাঁকে ওই সংযোগ স্থাপনের কাজ করতে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পা ধরে অনুরোধ করে আনিছ বলেন, ‘স্যার, আমার কিছু হলে সব শেষ হয়ে যাবে। আমার পরিবার পথে বসে যাবে।’ তবুও উপ-সহকারী প্রকৌশলী রউফের মন গলাতে পারেননি বিদ্যুৎকর্মী আনিছ।
জানা গেছে, ডিএসএসের কর্মী হিসেবে মো. আনিছের দায়িত্ব ছিল মেইনটেন্যান্স গ্যাংকে সহযোগিতা করা। মিটার স্থাপনের কাজে তিনি পারদর্শী ছিলেন না। নিয়ম অনুযায়ী, ফিডার চালু রেখে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার বিধান নেই। অথচ অভিযোগ রয়েছে, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রউফের নির্দেশেই বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রেখে মিটার স্থাপনের কাজ করানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বিদ্যুৎকর্মী আনিছ।
নিহত আনিছের বিয়াই ডেমরা ডিভিশনের একজন ফোরম্যান বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ফোরম্যানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। পরে নিহতের পরিবারকে মামলা না করে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী ও ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান। এতে ভয়ে পরিবারের সদস্যরা চুপ হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনায় ডিপিডিসির কাজলা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম আব্দুল জব্বারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফের অবহেলায় বিদ্যুৎকর্মী আনিছের মৃত্যু হয়েছে। কারণ, নিহত কর্মীর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। তিনি আরও বলেন, কোনোভাবেই বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রেখে এ ধরনের কাজ করা ঠিক হয়নি।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলীর নির্দেশে ডেমরা ডিভিশনের প্রকৌশলীরা একজোট হয়েছেন। তাঁরা সবাই গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে চলছেন বলেও জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগেও মাতুয়াইল ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ফিরোজের ভাই কালামকে একই ধরনের কাজের নির্দেশ দিয়েছিলেন ডেমরার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফ। সে সময়ও আব্দুল রউফের ভুলের কারণে বিদ্যুৎকর্মী কালামের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তখনও টাকার জোরে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্যুৎকর্মী বলেন, ‘শাটডাউন ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রেখে কাজ করানো হয়েছে। অথচ বিদ্যুৎ সংযোগ চালু রেখে এ ধরনের কাজ করার কোনো বিধান নেই। এ ঘটনার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফ কিংবা নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান স্যার। তাঁদের ভুলের কারণে বলি হয়েছেন একজন বিদ্যুৎকর্মী।’
প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী কাজ শুরুর আগে শাটডাউন নেওয়ার কথা থাকলেও কাজ চলাকালে বিদ্যুৎ লাইন চালু ছিল। মুহূর্তেই বিদ্যুতের ঝলকে পুড়ে যায় মো. আনিছের শরীর। কিছু সময় বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলে থাকার পর ছিটকে নিচে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর কোনো বিদ্যুৎ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেননি। এমনকি নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতিও কেউ সমবেদনা জানাননি।
বিজ্ঞাপন
কর্মীদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফ কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। বরং কোনো ধরনের নিরাপত্তা যাচাই ছাড়াই শ্রমিকদের বিদ্যুতের লাইনে কাজ করতে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে ডিপিডিসির ডেমরার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনা শুনেই পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ডিপিডিসির ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করে ঘটনার কথা শুনেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী বলেন, ‘আমি ঘটনা শুনেছি। তবে পুরোপুরি জানি না। আপনি নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেন। এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না।’
ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জ জোনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমি ঘটনা শুনেছি। তবে যেহেতু তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাই এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান কথা বলবেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) ও নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন)-এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. রবিউল হাসান বলেন, ‘আমি ঘটনাটি সম্পর্কে জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। সংশ্লিষ্ট কারও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমুলপাড়া বিহারী ক্যাম্প এলাকার সোনা মিয়া মার্কেটের সামনে সঞ্চালন লাইনে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ডিপিডিসির বার্ষিক ঠিকাদারি শ্রমিক মো. নজরুল ইসলাম (৫৫)।








