বক্তার আড়ালে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর ভয়ংকর রূপ, নেপথ্যে কী আল কায়েদা?

ধর্মীয় বক্তা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ, বিতর্কিত বক্তব্য, সরকারি জমি দখল, মাহফিলে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিয়ম এবং জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার পক্ষে প্রচারণার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছেন তিনি। সবশেষ গত ১৯ অক্টোবর চাঁদপুরে একটি মাহফিলে সাংবাদিকদের ‘কুত্তার মতো পেটানোর’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন জৈনপুরী পীর হিসেবে পরিচিত এই ধর্মীয় বক্তা।
বিজ্ঞাপন
তাঁকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মসজিদ ভাঙার হুমকি, জঙ্গিবাদে সমর্থন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, সরকারি রেলওয়ের জমি দখল এবং মাহফিলের জন্য অগ্রিম অর্থ নিয়েও উপস্থিত না হওয়ার অভিযোগ। ২০২৫ সালে সরকারকে সশস্ত্র বিপ্লবের হুঁশিয়ারি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০০৩-০৪ সালে ঢাকার তেজগাঁও ও নারায়ণগঞ্জে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুর, তাঁদের উচ্ছেদের দাবি এবং নারায়ণগঞ্জ অচল করে দেওয়ার হুমকিকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসে আব্বাসীর নাম। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিও তিনি তুলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় তাঁর নামও এসেছিল বলে দাবি করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব ঘটনা তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেয়।
আব্বাসীকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি বিষয় হলো মাহফিলে অংশগ্রহণের সম্মানী ও যাতায়াতের খরচ। ২০১৮ সালে নাটোরে একটি মাহফিলে মাত্র এক ঘণ্টা ওয়াজের জন্য হেলিকপ্টার ভাড়াসহ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য সামনে আসে। এরপর তাঁকে ‘হেলিকপ্টার হুজুর’ নামে অভিহিত করা হয়।
এ ছাড়া ২০২১ সালে সুনামগঞ্জ এবং ২০২৪ সালে উখিয়ার দুটি মাহফিলে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে উপস্থিত না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় আয়োজকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
২০১৯ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় আব্বাসীর বিরুদ্ধে সরকারি রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার জমি জবরদখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগে মামলা হওয়ার তথ্য সামনে আসে। একই বছর তাঁর ছোট ভাই নেয়ামত উল্লাহ একটি কারখানায় সশস্ত্র হামলা ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় আব্বাসীর ওপর বর্তায় না।
আব্বাসীকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি সামনে আসে ২০২১ সালে। সে সময় পল্টন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হয় বলে জানা যায়।
গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে মামলার বাদী এম এ সামাদ অভিযোগ করেন, এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আল-কায়েদাকে ইসলাম রক্ষার একমাত্র সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার অভিযোগও করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, আব্বাসী বাংলাদেশে আল-কায়েদার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ‘মুজাহিদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার অভিযোগও এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জঙ্গি’র সঙ্গে তুলনা করার অভিযোগে আব্বাসীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই বছর ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য এবং হিটলারের গণহত্যাকে সমর্থনের অভিযোগে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর তাঁর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয় বলে দাবি করা হয়। এর পর তাঁকে যুক্তরাজ্য ছাড়তে হয়েছিল বলেও বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
২০২৫ সালে ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে ‘কাফের’ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত উসকে দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে আব্বাসীর বিরুদ্ধে। একই বছর শাপলা চত্বরে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগও সামনে আসে।
২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে জড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টির অভিযোগের পর, গত ১৯ অক্টোবর চাঁদপুরে সাংবাদিকদের ‘কুত্তার মতো পেটানোর’ মন্তব্য নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন ভাষা ব্যবহার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দরবারের পীর থেকে আলোচিত ধর্মীয় বক্তা হয়ে ওঠা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ওঠা অভিযোগ এখন জনপরিসরে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি বিদ্বেষ ছড়ান, সহিংসতার হুমকি দেন কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
তবে অভিযোগ, মামলা এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। আব্বাসীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নথি, তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি কত দ্রুত হবে? ধর্মীয় বক্তব্যের আড়ালে বিদ্বেষ বা সহিংসতার উসকানি দেওয়া হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি? নাকি বিতর্ক চলতেই থাকবে, আর সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি থেকে যাবে অনিশ্চিত?








