Logo

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মহিউদ্দিনের ভয়ঙ্কর অপরাধ সাম্রাজ্য!

profile picture
বিশেষ প্রতিবেদক
১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:০০
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মহিউদ্দিনের ভয়ঙ্কর অপরাধ সাম্রাজ্য!
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মহিউদ্দিন। ফাইল ছবি

মানুষের প্রাণ বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা, যখন এরকম সুনাম জনসাধারণের মাঝে সুপ্রতিষ্ঠিত। সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়েই প্রতারণা করে সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় শত কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য! সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর মোঃ মহিউদ্দিন খন্দকার মিজানের বিরুদ্ধে উঠেছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

বিজ্ঞাপন

মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগই নয়, উঠে এসেছে নিজ গর্ভধারিণী মা ও সহোদর ছোট ভাই ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ড্রাইভার, আব্দুল মোমিনকে হত্যার মতো শিউরে ওঠা ভয়ঙ্কর সব তথ্য।

লোভের অনল ও মা-ভাইকে হত্যার অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার বড়হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের ছেলে মহিউদ্দিন খন্দকার মিজান ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে স্টেশন অফিসার পদে যোগদান করেন। সরকারি চাকরির সুবাদে এলাকায় এক আধিপত্যবাদী বলয় গড়ে তোলেন মহিউদ্দিন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি প্রতারণামূলকভাবে তাঁর পিতা মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে হরিরামপুর মৌজার মূল্যবান ৫১ শতক জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় প্রথমত ছোট ভাই আব্দুল মোমিনকে ভুয়া মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তার করানো হয়। পরবর্তীতে গর্ভধারিণী মা দুলালী বেগম ছেলের এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে স্বজনরা অভিযোগ করেন। মায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুবিচারের আশায় ছোট ভাই আব্দুল মোমিন আদালতে মামলা (সি.আর-১৪৫/২০২২) দায়ের করেন।

অমানবিক নির্যাতন ও পরিকল্পিত মায়ের হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে ছোট ভাই মোমিন পড়েন মহিউদ্দিন মিজানের ভয়াবহ রোষানলে। তাকে চুরির মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, জেলগেট থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাপট দেখিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন বিভিন্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে বেআইনিভাবে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন ও করেছেনএই মহিউদ্দিন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে স্টাফ অফিসার থাকায় জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিসের অফিস কোয়ার্টারে তাকে বেআইনিভাবে আটকে রেখে স্লো-পয়জনিংয়ের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের সহায়তায় মোমিনকে উদ্ধার করা হলেও, মহিউদ্দিন কৌশলে তাকে নিজ জিম্মায় নিয়ে যায়। এরপরই ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে নিজ শয়নকক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মোমিনের মরদেহ। মায়ের মতো ছোট ভাইকেও হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে “আত্মহত্যা” বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিল মহিউদ্দিন বলে অভিযোগ স্বজনদের।

বিজ্ঞাপন

ভাইকে হত্যার পর মহিউদ্দিনের জালিয়াতির রাজত্ব নতুন মাত্রা পায়। মোকামতলা ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিহত ছোট ভাই আব্দুল মোমিনের প্রকৃত ওয়ারিশ—তার স্ত্রী শাহানা আক্তার ও এক শিশু সন্তানের নাম সম্পূর্ণ গোপন করা হয়। জাল কাগজপত্র তৈরি করে মৃত আব্দুল মোমিনকে “অবিবাহিত” দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশান সনদ গ্রহণ করেন তিনি। এর মাধ্যমে ছোট ভাইয়ের সমস্ত স্থাবর সম্পত্তি এবং ফায়ার সার্ভিসের চাকরি-পরবর্তী বিভাগীয় কল্যাণ তহবিলের টাকা ফ্যাসিস্ট সরকারের স্টাফ অফিসার হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন এই বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন। একইভাবে চাকরির প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের আপন ফুফু ছালেমা বেগম এবং ফুফাতো বোন ফেন্সি বেগমের জমিও রেজিস্ট্রি করে আত্মসাৎ করেছেন এই মহিউদ্দিন। তার প্রতিবেশী এক ভাই নুর আলম এর কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন।

ফায়ার সার্ভিসকে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলা মহিউদ্দিন খন্দকার মিজান ২০১৯ সালের ৭ মার্চ পরিচালক অর্থ প্রশাসনের স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ফায়ার সার্ভিসে তৈরি করেন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েকবার বদলি হলেও প্রভাব খাটিয়ে থেকে যান একই পদে। ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্টেশন অফিসার থেকে ওয়্যার হাউস ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি হলেও একইভাবে পরিচালক অর্থ প্রশাসনের স্টাফ অফিসার পদে বহাল থাকেন, বারংবার অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য। ফায়ার ফাইটার ও ড্রাইভার নিয়োগকে কেন্দ্র করে মোট ৩৫০০ কর্মীর থেকে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেন মাস্টারমাইন্ড মহিউদ্দিন মিজান। এবং নিজের আপন ভগ্নিপতি কে বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে, ফায়ার সার্ভিসে ড্রাইভার পদে চাকরি দেন। মহিউদ্দিনের ক্ষমতার দাপট এতই বেশি যে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খুলতেও ভয় পাই! কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে জানে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়।

এ ছাড়া বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সহায়তায় তিনি অপরাধের পাহাড় গড়ে তোলেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে মহিউদ্দিন নতুন রূপ ধারণ করেন।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরতে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে তদবির চালান তিনি।

মহিউদ্দিন এক প্রভাবশালীর প্রতিমন্ত্রীর শ্যালক বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তার সিন্ডিকেটের সদস্য ড্রাইভার সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে লেনদেন সংক্রান্ত এবং নারীঘটিত কারণে মারামারি করায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তারপর নড়েচড়ে বসে ফায়ার সার্ভিস। এরপরই মহিউদ্দিন খন্দকার মিজানসহ তার সিন্ডিকেটের সদস্য ড্রাইভার সাখাওয়াত, নোয়াখালী সুবর্ণচর ফায়ার স্টেশনের সাময়িক বরখাস্তকৃত ফায়ার ফাইটার কামাল ও চাঁদপুর ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার শাহিনকে দুর্নীতি ও ফায়ার সার্ভিস এর বিরুদ্ধে গুজব ও প্রোপাগান্ডা ও নারীকেলেঙ্কারি ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে সাময়িক বরখাস্ত ও বদলি করে। বরখাস্তের পরই ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের দপ্তরে আসতে থাকে মহিউদ্দিনের নামে একের পর এক অভিযোগ।

বরখাস্তকৃত সিন্ডিকেট বর্তমান প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে না পেরে এবং অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে না পেরে ফায়ার সার্ভিসের নামে বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া অভিযোগ দায়ের করছে। সিরাজগঞ্জ এর মৃত ড্রাইভার শিহাবের স্ত্রী লাবনী আক্তারের নাম দিয়ে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ড্রাইভার সাখাওয়াত ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও একাধিক বিবাহ,নারী কেলেঙ্কারি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের সংশ্লিষ্ট থাকায় তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়

বিজ্ঞাপন

এবং তার তৃতীয় স্ত্রী সানজিদার সাথে মিরপুর ট্রেনিং কমপ্লেক্স ভবনে অফিস চলাকালীন সময় দস্তাদস্তুীর লিপ্ত হন। তার বিরুদ্ধে জাতীয় কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা একজন সাধারণ ড্রাইভার থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া তদন্ত দাবি করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসকে তদন্তের নির্দেশ প্রদান করেছেন। ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম বিষয়টি তদন্ত করছেন, ফায়ার সার্ভিসের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, তদন্তের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুদকের অভিহত করা হবে ।

নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে মহিউদ্দিন খন্দকার মিজান এর সিন্ডিকেট ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে করে নতুন পদোন্নতি মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যায়।

সাময়িক বরখাস্তের আদেশে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি অফিসে না এসে সচিবালয়ে তদবির বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ আছে। সম্প্রতি ড্রাইভার সিহাব আত্মহত্যার বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের জন্য ও বর্তমান মহাপরিচালক এবং পরিচালকদের বিতর্কিত করতে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে মহিউদ্দিন।

বিজ্ঞাপন

মৃত সিহাবের ২য় স্ত্রী মোছা. লাবনী আক্তারকে ফুসলিয়ে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার জন্য একাধিকবার ফোন করেন এবং বলেন আপনার স্বামীর পেনশনের টাকা কখনো কোনদিন পাবেন না। এই বলে প্রতিনিয়ত লাবনী আক্তার কে উত্তপ্ত করতে থাকেন মহিউদ্দিন সিন্ডিকেট। মহিউদ্দিনের সেই আর্থিক প্রলোভন নাকচ করে দেন সিহাবের স্ত্রী লাবনী। তিনি বলেন, “আমার স্বামী সিহাব কোনো বদলি বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল না। সিহাবের কাছে কেউ টাকা-পয়সা পান না ও দাবিও করেন তিনি।এবং ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান মহাপরিচালক ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করার জন্য আমাকে ফোনে ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখানো হয়। আমি তাদের প্রলোভনে সাড়া দেইনি।”

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD