Logo

সায়েদাবাদ পার্কে শিশুর হাসির বদলে এখন ময়লার গাড়ির সারি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৩৮
সায়েদাবাদ পার্কে শিশুর হাসির বদলে এখন ময়লার গাড়ির সারি
ছবি: সংগৃহীত

একসময় শিশুদের হাসি-আনন্দ, নানা রাইড আর সবুজ পরিবেশে মুখর থাকত রাজধানীর স্বামীবাগ-সায়েদাবাদের সায়েদাবাদ ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক। এখন সেই জায়গাজুড়ে সারি সারি ময়লার গাড়ি, লোহালক্কড় ও নানা সরঞ্জামের জঞ্জাল। নেই কোনো রাইড, নেই বিনোদনের ব্যবস্থা, বদলে গেছে পুরো পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

পুরান ঢাকার স্বামীবাগ ও সায়েদাবাদের সংযোগস্থলে সায়েদাবাদ লেভেলক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সায়েদাবাদ ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক। স্থানীয়ভাবে সায়েদাবাদ পার্ক নামে পরিচিত এ জায়গায় প্রায় ২০টি রাইড ছিল। ট্রেন, ভয়েজার বোর্ড, প্যারাট্রুপার, টুইস্টার, সুপার চেয়ার, মিনি ট্রেন, বেবি কার ও ওয়ান্ডার হুইলের মতো বিভিন্ন রাইড শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। পার্কজুড়ে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালাও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পার্কটি যে জায়গায় গড়ে উঠেছিল, সেখানে আগে একটি বড় পুকুর ছিল। পরে জায়গাটি ভরাট করে পার্ক নির্মাণ করা হয়। চালুর পর সায়েদাবাদ, স্বামীবাগ, যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকার মানুষ নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতেন। শিশুদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষও হাঁটা ও অবসর কাটানোর জন্য জায়গাটি ব্যবহার করতেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ সমস্যায় পার্কটির দর্শনার্থী কমতে থাকে। পরে ফ্লাইওভার চালু হলেও যানবাহনের চাপ, সড়কের দুরবস্থা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে আগের মতো মানুষের আনাগোনা আর ফেরেনি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পরিচালনা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পার্কের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২২ সালে জায়গাটি ময়লার গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার শুরু করা হয়। এর আগে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসংলগ্ন মোটর গ্যারেজ এলাকায় ময়লার গাড়ি রাখা হতো। পার্কের জায়গা অন্য কাজে ব্যবহারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে স্থানীয়দের একাংশ মেয়র ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও করেছিলেন বলে তারা জানান।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে জায়গাটিতে কোনো রাইড বা পার্কের স্থাপনা নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো চত্বর এবড়ো-থেবড়ো হয়ে আছে। বিভিন্ন স্থানে কাদাপানি জমে রয়েছে এবং এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে ময়লার গাড়ি। চারপাশে দুর্গন্ধও রয়েছে। কিছু গাছ থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়।

গ্যারেজের এক কর্মীর ভাষ্য, এখানে নিয়মিত ১০০ থেকে ১৫০টি ময়লার গাড়ি থাকে। সায়েদাবাদ ও আশপাশের এলাকায় বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা থাকায় যানজটের মধ্যে গ্যারেজে গাড়ি আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বামীবাগের বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এখন যে জায়গায় ময়লার গাড়ি রাখা হয়, তার পূর্বপাশে একসময় একটি বড় পুকুর ছিল। পরে সেই পুকুর ভরাট করে পার্ক বানানো হয়। সেখানে অনেক গাছও ছিল।’

বিজ্ঞাপন

ময়লার গাড়ি রাখার কারণে শুরুর দিকে দুর্গন্ধ নিয়ে স্থানীয়রা আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, এখন অনেকটা সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষ মানিয়ে নিয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, সায়েদাবাদ ও ধলপুর এলাকায় একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পটি শেষ হলে ময়লার গাড়িগুলো সায়েদাবাদের বর্তমান জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জায়গাটি খালি হওয়ার পর সেখানে আবার পার্ক নির্মাণের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে জায়গাটি পার্ক বা অন্য কোনো স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। সে বিষয়ে তখনকার প্রশাসক বা মেয়র প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপক গোলাম মোর্শেদ জানান, সায়েদাবাদের জায়গাটি মূলত অস্থায়ীভাবে ময়লার গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ধলপুরে প্রায় ২০ একর জায়গার ওপর স্থায়ী গ্যারেজ নির্মাণের কাজ চলছে এবং এরই মধ্যে কাজের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি শেষ হতে আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য, ধলপুরের গ্যারেজ চালু হলে সায়েদাবাদ থেকে ময়লার গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর জায়গাটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকার বা সিটি করপোরেশন নেবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূইয়াও জানান, সিটি করপোরেশনের মেকানাইজড কার পার্কিং প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বর্তমানে সায়েদাবাদে রাখা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গাড়িগুলো সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

হারিয়ে গেছে পুরোনো সায়েদাবাদ পার্কও

বিজ্ঞাপন

সায়েদাবাদ এলাকায় এর আগে থাকা আরেকটি ছোট পার্কও দীর্ঘদিন ধরে নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, দক্ষিণ ও উত্তর সায়েদাবাদের বিপুলসংখ্যক বাসিন্দার জন্য একসময় এটি ছিল অন্যতম খোলা জায়গা। শিশুদের জন্য দোলনা ও স্লাইডের পাশাপাশি বড়দের বসার ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে জায়গাটিতে ময়লা ফেলা, গাড়ি পার্কিং এবং গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়। পরে ফ্লাইওভার নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজে জায়গাটি ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একপর্যায়ে সেখানে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয় এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়।

ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় করা চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষে জায়গাটি সংস্কার করে শিশুদের জন্য রাইড স্থাপন এবং সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। তবে ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হলেও জায়গাটি আর পার্ক হিসেবে ফিরে আসেনি।

সায়েদাবাদের বাসিন্দা খলিল শেখ বলেন, ‘গত ২০ বছর আমি এই এলাকায় থাকি। জনপথ মোড়ের পশ্চিম পাশে তিন কোনার মতো যে জায়গাটা, সেখানে আমরা পার্ক দেখেছি। ফ্লাইওভার বানানোর আগে থেকেই জায়গাটিতে ময়লা ফেলা শুরু হয়। এরপর ফ্লাইওভার যারা বানাইছে তারা এখানে বিল্ডিং বানায়। ওই অবস্থাই এখন আছে।’

বিজ্ঞাপন

সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, বর্তমানে যে জায়গাটি একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ব্যবহারকাল বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে থাকলে জায়গাটি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার বিষয়েও তিনি জানান।

একসময় শিশু-কিশোরদের কোলাহল, মানুষের হাঁটাচলা ও সবুজ পরিবেশে প্রাণবন্ত থাকা সায়েদাবাদের এসব জায়গা এখন নগর ব্যবস্থাপনার ভিন্ন বাস্তবতার সাক্ষী। ময়লার গাড়ির অস্থায়ী গ্যারেজ সরানোর পরিকল্পনা থাকলেও সেখানে আবার শিশুদের জন্য পার্ক ফিরবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD