Logo

বাড়ছে নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যা, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে অনেক পরিবার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:২৫
বাড়ছে নিখোঁজ শিশুদের সংখ্যা, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে অনেক পরিবার
ছবি: সংগৃহীত

দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে অনেক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন তাদের সন্ধান মিলছে না। ফলে সন্তান হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে অসংখ্য পরিবার।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—মাত্র সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু। অর্থাৎ জিডি হওয়া নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশ এখনো পরিবারের কাছে ফেরেনি।

তবে নিখোঁজ থাকা এসব শিশুর মধ্যে কতজন জীবিত রয়েছে কিংবা কারও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না—সে বিষয়ে আলাদা কোনো হিসাব নেই পুলিশ সদর দপ্তরে। ফলে নিখোঁজের সামগ্রিক পরিসংখ্যানের মধ্যে শিশুদের পরবর্তী পরিণতি সম্পর্কে একটি বড় অংশ অজানাই থেকে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে সুনামগঞ্জে অচেতন বাবার পাশ থেকে নিখোঁজ তিন ভাই-বোনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মানিকগঞ্জেও মা-বাবার মরদেহের পাশ থেকে নিখোঁজ দেড় বছর বয়সী আলিজা নূরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ৩১ জনের বেশি শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ৮১টি মামলা হয়েছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ৬৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে এবং শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৯ জনকে। একই সময়ে নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ পাওয়া গেছে ৩৬ শিশুর।

নিহত ২৫৪ শিশুর মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের সংখ্যা প্রায় ৪৩ শতাংশ। শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী ৭৪ শিশু এবং সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ৬০ শিশু বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছে। আসক জানিয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।

বিজ্ঞাপন

আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, ‘নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, তাকে উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত- এসব বিষয় নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের আওতায় আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সংবিধান, জাতীয় শিশু নীতি, শিশু আইন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী এ দায়িত্ব পালনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বয়সভেদে শিশু নিখোঁজ হওয়ার কারণও ভিন্ন। শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুরা পরিবারের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো কারণে নিখোঁজ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় আত্মগোপন, স্বাধীনভাবে থাকার আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো বিষয়কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নিখোঁজের ঘটনায় অনলাইন জিডি ব্যবস্থা চালুর পর এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০। পুলিশের হিসাবে প্রতিবছর নিখোঁজ শিশুদের ৯০ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়।

তবে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগও রয়েছে। অনেক পরিবারের দাবি, নিখোঁজ হওয়ার পরপর থানায় জানানো হলেও দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয় না। কখনো কখনো জিডি করার আগেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নিতে বলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুরের মতলব থেকে গত ৫ সেপ্টেম্বর মাদরাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সী সাবের ইসলাম শাফি। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে দুই দিন পর থানায় জিডি করেন তার বাবা সোহেল প্রধান।

শিশুটির মা সাথী আক্তার বলেন, ‘আমি থানায় গেলে পুলিশ কেবল বলে দেখতেছি। কিন্তু রাস্তার সিসি ক্যামেরা পর্যন্ত একবার দেখলো না তারা। ১৫ দিনেও পুলিশ কিছু বলতে পারছে না।’

অভিযোগের বিষয়ে জিডির তদন্ত কর্মকর্তা ও মতলব থানার উপপরিদর্শক শুভজিৎ পাল বলেন, ‘ছেলেটা রাগ করে হয়তো চলে গেছে, হয়তো লেখাপড়া ভালো লাগে না, তাই নিজে কোথাও পালিয়ে আছে। তার সঙ্গে মোবাইল নেই। তাই কোনো কিছু পাচ্ছি না।’

বিজ্ঞাপন

তবে সব নিখোঁজের পরিণতি একই নয়। রাজধানীর বংশাল থেকে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ হওয়া এক কিশোরীকে প্রায় এক বছর পর উদ্ধার করেছে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্তের পর ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে শাহ আলী থানা এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে ‘মুন অ্যালার্ট’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও কাজ করছে। জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্ম অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করে।

মুন অ্যালার্টের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেন, ‘নিখোঁজদের পরিবার থানায় গেলে জিডি করা নিয়ে একটি জটিলতা সৃষ্টি হয়। আবার জিডি হলেও দ্রুত খোঁজার কাজে বিলম্ব হয়। নিখোঁজের তিন ঘণ্টার মধ্যে শিশুটিকে উদ্ধার করা সহজ। ওই সময় পেরিয়ে গেলে বিষয়টি জটিল হয়। কখনো কখনো থানা থেকে আগে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খুঁজে এসে জিডি করতে বলা হয়।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘নিখোঁজদের খুঁজে পেতে পুলিশের আলাদা সেল গঠন করতে হবে। যেন সঙ্গে সঙ্গে তারা কাজ শুরু করতে পারে। সেই লজিস্টিক সাপোর্টও তাদের থাকতে হবে।’

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানের মতে, অনেক পরিবার সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পরও পুলিশকে বিষয়টি জানায় না। বিশেষ করে কিছু এলাকায় এ প্রবণতা বেশি দেখা যায় বলে তিনি জানান। আইনি সহায়তা বা জিডি করতে সমস্যায় পড়লে এমএসএফ সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ও কার্যকরভাবে তৎপর হলে অনেক নৃশংস ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ নিখোঁজের ঘটনায় জিডি বা মামলা নিতে অনাগ্রহ দেখায়। অপরাধের পরিসংখ্যান কম দেখানোর প্রবণতা থেকেই এমনটি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে পুলিশকে আরও আন্তরিক ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজের ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার সব পক্ষকেই শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশুরা যেন বিপদে পড়লে নির্ভয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে আশ্রয় ও সহযোগিতা চাইতে পারে সেই নিশ্চয়তাও তৈরি করা জরুরি।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখে। নিখোঁজের ঘটনায় করা প্রায় ৯০ শতাংশ জিডিরই নিষ্পত্তি হয় এবং সংশ্লিষ্ট শিশুদের খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। তবে বাকি ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয় না।’

তিনি বলেন, ‘কিছু শিশু নিজের ইচ্ছায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিয়ে করে কিংবা আত্মগোপনে থাকে। এ ধরনের ঘটনায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এসব নিখোঁজের ঘটনা অনেক সময় সমাধান করা সম্ভব হয় না।’

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD