সারাদেশে নির্মমভাবে শিশু হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগ জনমনে

কুমিল্লায় অপ্রতিমকে দাফনের পর দিনই ঘটে গেল আরও এক হৃদয় বিদারক নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। গতকাল কুমিল্লার দেবিদ্বারে মা ও ভাবিকে কুপিয়ে এবং আট মাস বয়সী ভাতিজিকে আছড়ে হত্যার অভিযোগ এক যুবকের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
গত এক বছরে (প্রায় সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত) বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা এবং অন্যান্য সহিংসতায় শিশুহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শত শত শিশু এসব ঘটনার শিকার হয়েছে।
২০২৫ সালে দেশে অন্তত ১২৪ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মেয়েশিশু ৬৩ জন এবং ছেলেশিশু ৫৯ জন। একই বছরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩০৮ জন শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ১৯৭টি, ধর্ষণচেষ্টা ৭৭টি এবং ধর্ষণের পর হত্যা ১০টি। আসকের তথ্যে ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় ৪৫৬ জন মেয়েশিশু ও ৪৮ জন ছেলেশিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২২ জনকে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আসকের হিসাবে বিভিন্ন সহিংসতায় মোট ১৫৫ জন শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮ জন, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ জন, ধর্ষণের পর হত্যা ২৬ জন (দুই ছেলেশিশুসহ) এবং ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪ জন। একই সময়ে নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে ৩৬টি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশু নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হলেও প্রায় ২ হাজার ৩৮ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এইচআরএসএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত, ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০ মাসের (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল) হিসাবে ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত শিশুর সংখ্যা ৬৪৩।
আসকের ১০ বছরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬ হাজার ৩১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জনকে। ২০২৫ সালে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা শিকারের পরিচিত ব্যক্তিÑপ্রতিবেশী, আত্মীয় বা শিক্ষক। ঘটনাগুলোর বড় অংশ ঘটেছে বাড়িতে বা পারিবারিক পরিসরে। ০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা ও কম সাজার হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ট্রাইব্যুনালে লাখের ওপর মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান ও আশঙ্কাজনক অবনতিতে জনমনে চরম উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাতের বেলা দূরপাল্লার মহাসড়কে সংগঠিত নৈরাজ্য এবং বাজারে প্রকাশ্যে অনৈতিক চাঁদাবাজির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং বেআইনি সামাজিক সালিশের পুনরুত্থান, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন’ (এমএসএফ)-এর সদ্য প্রকাশিত এক বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত জুলাই মাসের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাসে দেশে হত্যা, আত্মহত্যা, অপহরণ, নিখোঁজ এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রতিটি সূচকেই অপরাধমূলক ঘটনা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
ওই তথ্যমতে, এক মাসের ব্যবধানে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ৩০৬টি থেকে বেড়ে ৩২৭টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২টি থেকে আগস্টে একলাফে ৯১টিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৭৫ শতাংশের এক ভীতিকর বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম শিথিলতা ও অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগে অপরাধচক্রগুলো কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তা এমএসএফ-এর পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
বিজ্ঞাপন
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭২ শতাংশ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সাথে আত্মহত্যা ৩৯ শতাংশ, অপহরণ ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ৮ শতাংশ এবং মাদক সংক্রান্ত মামলায় আটকের সংখ্যা ১২৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল অপরাধের সংখ্যাই বাড়েনি, বরং প্রচলিত আইনি ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গ্রামগঞ্জে বেআইনি সালিশ বসিয়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার এক মধ্যযুগীয় প্রথা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
গাইবান্ধায় ধর্ষণের এক ঘটনায় ভুক্তভোগীকে অভিযুক্তের সাথে সাত লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে দেওয়া, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রাম্য সালিশে বেত্রাঘাত ও অর্থদণ্ড দিয়ে বিচার এড়ানোর চেষ্টা এবং শরীয়তপুরে ১২ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা মাত্র এক লাখ টাকায় মীমাংসার মতো অমানবিক নজির নথিভুক্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি লালমনিরহাটে অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা এবং তিনটি জীবিত নবজাতককে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারের ঘটনা সামাজিক অস্থিতিশীলতার গভীর ক্ষতকেই ফুটিয়ে তোলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ক্রমঅবনতির নেপথ্যে মূলত পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, থানাগুলোর নিয়মিত টহল ব্যবস্থার ঘাটতি এবং কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারির অভাব প্রধান ভূমিকা রাখছে।








