Logo

সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান

profile picture
বশির হোসেন বাবু
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২:১৯
সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসানাি। ফাইল ছবি

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান যেন পরিণত হয়েছে একটি অঘোষিত ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্যে’। সরকারি ইজিপি ও আইবাসের মতো স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন বহিরাগত ব্যক্তি এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়াকরণ, কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লুটপাট সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি জনৈক আরিফ নামের এক ব্যাক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের আস্থাভাজন বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালনা করাচ্ছেন ইজিপি ও আইবাসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসানের ইজিপি ও আইবাস আইডির পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অফিসে বসেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ওয়ার্ক অর্ডার আপলোড, বিল এন্ট্রি এবং আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণের মতো স্পর্শকাতর কাজ করছেন আউটসোর্সিং এক কর্মচারীর নামে। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ রয়েছে, হিসাব শাখাকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়ে পুরো আর্থিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাঁর বিশ্বস্ত ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরেই এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তিনি অন্য সব স্থানে দায়িত্বে থাকাকালেও একই কৌশলে আনোয়ারকে ব্যবহার করেছেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। পরে সিরাজগঞ্জে বদলি হয়ে আসার সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন।

অভিযোগকারীরা বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বাস্তবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কথিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এসএ এন্টারপ্রাইজ’ এর মাধ্যমে বিভাগটির অধিকাংশ লাভজনক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ডিভিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে বড় কাজ গুলো এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান একক ভাবে কাজ করেন। অন্য ঠিকাদাররা কাজ নিতে হলেও ওই প্রতিষ্ঠানে সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। ঠিকাদারদের কমিশনের মোটা অংশ চলে যায় প্রভাবশালী ওই চক্রের পকেটে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল বছরের পর বছর ঝুলে থাকলেও সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের বিল অস্বাভাবিক দ্রুততায় পরিশোধ করা হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ধাপেই মোটা অঙ্কের টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনিয়মের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, গত অর্থবছরের টাকার কাজ চলতি অর্থবছরের এপিপিতে (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরিকল্পিতভাবে সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দিতেই এ ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে।

বিভাগজুড়ে ‘লুটপাট সিন্ডিকেট’: অভিযোগ উঠেছে, বিভাগটিতে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেট। এতে নির্বাহী প্রকৌশলীর পাশাপাশি কয়েকজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই), বহিরাগত ব্যক্তি এবং প্রভাবশালী ঠিকাদার জড়িত রয়েছেন। বিশেষ করে এক এসডিই নির্বাহী প্রকৌশলীর বরাদ দিয়ে ঘুষ বাণিজ্য ও কমিশন আদায়ের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, বিল ছাড়, কাজ অনুমোদন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ‘পার্সেন্টেজ’ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, বিভিন্ন অভিযোগ বা অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঘুরেফিরে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাচ্ছে, ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের উন্নয়নকাজের প্যাকেজ বিভাজন, ঠিকাদার নির্বাচন ও বিল পরিশোধ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় সোয়া কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ ৩৭টি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে আরএফকিউ করার অভিযোগ রয়েছে।

পাশাপাশি নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি এবং কাজের পরিমাণের সঙ্গে বিল পরিশোধে অসঙ্গতির অভিযোগও করেছেন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিযোগের কথা জানা গেছে। সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রায় সোয়া কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ ৩৭টি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে আরএফকিউ করার অভিযোগ উঠেছে। একটি বড় প্রকল্পকে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক প্যাকেজে ভাগ করা সরকারি কাজ বাস্তবায়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হতে পারে। তবে একই ধরনের কাজ, একই সময়ে এবং কাছাকাছি এলাকায় বাস্তবায়নের জন্য কেন পৃথক প্যাকেজ করা হলোÑসেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। ৩৭টি প্যাকেজের কয়েকটি কাজ একই বা ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, কিছু কাজের ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ ও ২০২৫ সালের জুন ক্লোজিংকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩ কোটি টাকা বিল-ভাউচারের মাধ্যমে পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে যতটুকু কাজ হয়েছে, তার সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্য নেই। ‘বাবর অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতি, পরিমাপ বই এবং বিল পরিশোধের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান। দীর্ঘ চাকরি জীবনে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি প্লট, ফ্ল্যাট, গাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে মিলবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ।

বিজ্ঞাপন

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি বা প্রমাণক নেই। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের দরপত্র আহ্বান, বিধি অনুযায়ী তা মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সময়ে কার্যাদেশ প্রদান করা আমার অর্পিত দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

তিনি বলেন, “সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের সব দরপত্র শতভাগ ইলেকট্রনিক প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়। এই পদ্ধতিতে কোনো বিশেষ ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ঠিকাদার কর্তৃক দাখিল করা যোগ্যতার কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত ও রেসপনসিভ দরদাতাকে বিবেচনা করা হয়। এরপর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে যোগ্য ঠিকাদারদের মধ্যে সর্বনি¤œ রেসপনসিভ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।”

বিজ্ঞাপন

চলমান উন্নয়নকাজের বিষয়ে তিনি বলেন, “কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। কাজের পরিমাণ ও মান যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর বিধি অনুযায়ী ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রত্যাশী সংস্থার সন্তুষ্টি ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।”

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, “সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের সব কাজই প্রচলিত আইন, বিধি ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পাদন করা হয়েছে এবং বর্তমানে একই প্রক্রিয়ায় কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূতভাবে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং এ ধরনের কোনো ব্যত্যয়ও ঘটেনি।”

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD