বিদায়লগ্নে গণপূর্তে প্রকৌশলী আবুল খায়েরের মহালুটপাট

বিদায়লগ্নে এসেও কাটেনি মোহের ঘোর, থামেনি অর্থলিপ্সা। ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী, আগামী ১ অক্টোবর তাঁর যাওয়ার কথা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (পিআরএল)। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে একজন কর্মকর্তার ডেস্কে থাকার কথা বিদায়ের প্রস্তুতি আর ফাইল বুঝিয়ে দেওয়ার তাড়া, সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের দপ্তরে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিজ্ঞাপন
বিদায়ের কোনো বিষাদ সেখানে নেই; বরং শেষ মুহূর্তের ফায়দা লুটতে সেখানে বসেছে এক নজিরবিহীন ‘ঘুষ ও ফাইল অনুমোদন উৎসব’। অবসরের ঠিক আগের দিনগুলোতে শেষ রাত পর্যন্ত তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ফাইলের অনুমোদন এবং কোটি কোটি টাকার অনৈতিক আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার এক অবিশ্বাস্য মহোৎসবে মেতে উঠেছেন এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে এই শীর্ষ কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে, তার বিপুল অবৈধ সম্পদের যে খতিয়ান উঠে এসেছে, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)।
সূত্র বলছে, গণপূর্তের ঠিকাদার পাড়া থেকে শুরু করে প্রকৌশলীদের অন্দরমহল সবখানেই আবুল খায়েরের পরিচিতি ‘মিস্টার ৫%’ খায়ের’ হিসেবে। চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা এবং সর্বশেষ ঢাকা জোনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ কিংবা কাজের চূড়ান্ত বিল পাসের ফাইল তাঁর টেবিল থেকে ছাড়াতে অলিখিতভাবে দিতে হয় ৫ শতাংশ নগদ কমিশন। কমিশন দিতে সামান্য দেরি হলেই ফাইল আটকে যেত লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে। আর যারা এই অনৈতিক আবদারে সায় দিতেন না, তাঁদের কপালে জুটত ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার হুমকি।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা জোনের এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা খায়েরের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। ৫% কাটমানি না দিলে ফাইলের একটা পাতাও নড়ে না। এখন তিনি অবসরে যাচ্ছেন, তাই বকেয়া কমিশন উসুল করতে আমাদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছেন। টাকা না দিলে রানিং প্রজেক্টের বিল আটকে রাখার হুমকি দিচ্ছেন।”
বছরের পর বছর ধরে ঠিকাদারদের পকেট কেটে এবং সরকারি কোষাগার লুটে আবুল খায়ের গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। নিজের, স্ত্রী এবং নিকটাত্মীয়দের নামে ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্প, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভিআইপি জোন এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় বিঘার পর বিঘা জমি ও আলিশান খামারবাড়ি (ফার্মহাউস) গড়ে তুলেছেন তিনি।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে থাকাকালীন নকশা জালিয়াতি, প্লট অবৈধভাবে বরাদ্দ এবং ভুয়া বিল ভাউচার পাসের মাধ্যমে একাই প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। ১ অক্টোবরের পিআরএল-এর ডেডলাইনকে সামনে রেখে তিনি তড়িঘড়ি করে ব্যাকডেটে বিভিন্ন প্রজেক্টের কার্যাদেশ ও বিতর্কিত বিল ছাড়ের ফাইল সই করছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিদায় নেওয়ার পর যেন কোনো ঠিকাদার বকেয়া কমিশনের টাকা আটকে না রাখে, সেজন্য পিআরএল-এর ঠিক আগের দিনগুলোতে অগ্রিম টাকা বুঝে নিয়ে ফাইল ছাড়ার এই ‘মহালুটপাট’ চালাচ্ছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
গণপূর্তেরই এক কর্মকর্তা বলেন, “অফিসের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিদায়ের আগে পেনশনের ফাইল ও দায়িত্ব হস্তান্তরের কাজ করার কথা। কিন্তু খায়ের স্যার গভীর রাত পর্যন্ত বিতর্কিত ফাইল সই করছেন। যেসব ফাইলে বড় বড় আর্থিক অসঙ্গতি আছে, সেগুলোও এখন অলৌকিকভাবে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।”
অবসরের ঠিক পূর্বমুহূর্তে গণমাধ্যমে তাঁর এই ‘ঘুষ উৎসব’ এবং শত কোটি টাকার মানিলন্ডারিং-এর খবর তোলপাড় সৃষ্টি করার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধান দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মো. আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। পিআরএল-এ যাওয়ার সুযোগ নিয়ে তিনি যেন কোনোভাবেই আইন ও জবাবদিহিতার বাইরে চলে যেতে না পারেন, সেজন্য আমরা প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শুরু করেছি। ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আইনি প্রক্রিয়াও আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।”
বিজ্ঞাপন
দেশের নতুন ও পরিবর্তনকালীন সময়েও একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও শেষ মুহূর্তের লুটপাট কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারেরা। এখন দেখার বিষয়, বিদায়ের তোড়জোড় করা এই ‘লুটপাটের রাজপুত্র’ দুদকের লোহার খাঁচায় বন্দি হন, নাকি অধরাই থেকে যান!








