কৃষি সম্প্রসারণে সক্রিয় আওয়ামী সিন্ডিকেট

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের উন্নয়নের সাথে কৃষির উন্নয়ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিএনপি সরকার কৃষি সেক্টরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তার নির্বাচনী মেনুফেস্টো প্রণয়ন করে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, কৃষক কার্ড প্রদানসহ কৃষকদের উন্নয়নে ব্যপক পদক্ষেপ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার।
বিজ্ঞাপন
মাঠে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের দোসর কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রের কারনে কৃষক সার পাচ্ছেনা। ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রমান পেয়ে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহন শুরু করেছে। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে ঘাঁটি গেড়ে থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকদের অতীত কর্মকান্ডের আমলনামা পর্যালোচনা কৃষি মন্ত্রণালয় শুরু করেছে বলে জানা যায়।
কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম সন্তোষজনক নয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও বিভিন্ন অনিয়মের সাথে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পটির পরিচালক মো. রাশেদ হাসনাতের বিরুদ্ধে। এর ফলশ্রুতিতে কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
আওয়ামী দোসর কাজুবাদাম ও কফি গবেষনা উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শহিদুল ইসলাম খামারবাড়িতে বিভিন্ন প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পে থাকা অবস্থায় খাটো জাতের নারিকেল চারা আমদানীতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
এসএসিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. এমদাদুল হক বিগত আওয়ামী সরকারের একজন সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল কাইয়ুম মজুমদার বিগত সরকারের সময় লেবু জাতীয় ফসল চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের উপ প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার এন্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক খন্দকার রাশেদ ইফতেখার একজন আওয়ামী প্রেমিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি ৫ আগষ্ট ফ্যাসিস্টের পতনের পরও তার কক্ষ থেকে শেখ মুজিবের ছবি নামাননি।
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরী কাম হটিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান হানিফের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত। বিগত সরকারের সময় বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের নিয়ে ফেসবুকে তিনি বিভিন্ন ধরনের পোষ্ট দিতেন।
কথিত আছে যে, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্র বেগম খালেদা জিয়ার মুত্যুর দিনে ফেসবুকে গান গেয়ে উল্লাস করেছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে প্রচার করছেন। মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. রাসেল আহমেদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন, বিগত সময়ে তার নেতৃত্বে খামারবাড়ী নিয়ন্ত্রণ করতো কিশোরগ্যাং নামে পরিচিত তার বাহিনী।
বিজ্ঞাপন
বিসিআরএল প্রকল্পের লোকমান মজুমদার বিগত সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। সূত্র জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালকগন আওয়ামী আমলে অর্জিত অবৈধ অর্থ ব্যবহার করে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করার ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সম্প্রতি বিএনপি পন্থী কৃষিবিদদের সংগঠন এগ্রিকালচারিস্ট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) এর নেতৃবৃন্দ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করে প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ফ্যাসিস্টের দোসর কর্মকর্তাদের অপসারনের দাবি জানান।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ১১টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রেরণের ব্যাপারে এ্যাব'র সদস্য সচিব কৃষিবিদ শাহাদত হোসেন বিপ্লব দৈনিক জনবাণী কে জানান, এই প্রস্তাব প্রেরণের এখতিয়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের। এর সাথে এ্যাবের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রস্তাব প্রেরনের পূর্বে এ্যাবের সাথে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা হয়নি। তাছাড়া প্রেরিত প্রস্তাবে ফ্যাসিস্টের দোসর কিছু কর্মকর্তার নাম আছে বলে শুনেছি। তবে ফ্যাসিস্টের দোসর একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে আরেকজন ফ্যাসিস্টের দোসর কর্মকর্তাকে বসানো এ্যাব কোন ভাবেই মেনে নেবে না।
বিজ্ঞাপন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাঠানো প্রস্তাবে দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পার্টনারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ড. মো শাখাওয়াত হোসেন শরীফের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। শাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিগত সরকারের সময় ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারী মাস পর্যন্ত এনএটিপি ফেজ-২ এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে সেই একই প্রকল্পের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে এক বছরের বেশী সময় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, এনএটিপি ফেজ-২ প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে সাখাওয়াত হোসেন শরীফের বিরুদ্ধে অডিটের নামে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ভুয়া অডিটের আয়োজন এবং প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
এসব অভিযোগের তদন্তে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, কৃষি বিভাগের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আগামী ১ অক্টোবর ফেনী থেকে দেশব্যাপী প্রথম ধাপের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কর্মসূচি রয়েছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ঠিক আগে প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় প্রকল্পের নেতৃত্ব ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পার্টনার প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে নেওয়া প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পকে কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।
প্রকল্পটির শুরুর দিকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মো. মিজানুর রহমান। দুই বছরের মাথায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে সরিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিশোরগঞ্জের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। এক বছর না যেতেই আবারও প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ে দায়িত্ব পালনের সময় সাখাওয়াতকে ঘিরে আরও কিছু অভিযোগ করেছেন ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, তিনি কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক ও উপ-পরিচালককে নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। ওই বলয়ের মাধ্যমে ডিএইর বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার, বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর জন্য এই বলয় কাজ করছে। একই সূত্রগুলো দাবি করে, বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, বর্তমান সময়ে অধিদপ্তরের প্রকল্প, টেন্ডার ও বদলি-পদায়নকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রে বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা ছাড়াও প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তাকে বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সার সংকটসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও ওই গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।








