সেই গুলিবর্ষণকারী হাসানের ছায়ায় গণপূর্তের খায়ের

এক হাতে পিস্তল, মাথায় হেলমেট। উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। চারদিকে তখন গুলি আর সংঘর্ষ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে গুলি ছোড়ার দৃশ্যের কারণে আলোচনায় আসেন গণপূর্তের ঠিকাদার হাসান মোল্লা। সেই হাসান শুধু একজন ঠিকাদার নন গণপূর্তের ঠিকাদারি অঙ্গনে তার প্রভাব নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। আর সেই প্রভাবের নেপথ্যে উঠে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের নাম।
বিজ্ঞাপন
গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাসান ও খায়েরের ঘনিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী বলয়। এই বলয়ের প্রভাবেই টেন্ডার থেকে কার্যাদেশ, কাজের বিল থেকে ঠিকাদার নির্বাচন গণপূর্তের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, অর্থ পাচার মামলায় কারাদ-প্রাপ্ত সাবেক যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের ছত্রছায়ায় ঠিকাদারি শুরু করেন হাসান। এক পর্যায়ে তিনিই হয়ে ওঠেন গণপূর্তের কর্তা। এ কারবারে তাঁকে সহযোগিতা করেন গণপূর্তের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের। সাবেক গণপূর্ত ও গৃহায়ন প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও প্রধান প্রকৌশলী শামীম আকতারের ঘনিষ্ঠ আবুল খায়ের ছাত্রলীগের হাসানের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে নিয়ন্ত্রণ করতেন টেন্ডার ও ঠিকাদারি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, একসময় জি কে শামীমের মাধ্যমে গণপূর্তের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের। বড় অঙ্কের কাজ করত জি কে বিল্ডার্স লিমিটেড ও দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স। আর ১০ কোটি টাকার নিচের কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করত হাসানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মা-বাবার দোয়া কনস্ট্রাকশন।
বিজ্ঞাপন
২০১৯ সালে রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে জি কে শামীম আটক হলে তাঁর সাম্রাজ্যের পতন হয়। তবে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ ও অসাধু প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেটে ভর করে গণপূর্ত ছিলো মো. আবুল খায়েরের কব্জায়। জানা যায়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ ও প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের সঙ্গে হাসানের ঘনিষ্ঠতা ছিলো গলায়-গলায়।
অনেক কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের বিল তুলে দিতে সহযোগিতা করতেন এই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। তার পরে ঠিকাদারদের কাজ থেকে মোটা অংশের কমিশন নিতে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এ কাজ বাস্তবায়নে গণপূর্তের প্রজ্ঞাপন ও এপিপির নির্দেশনা অমান্য করে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে ৯৫ শতাংশ দরপত্র করেছেন আবুল খায়ের। হাসানের সিন্ডিকেটের ঠিকাদারকে কাজ দিয়ে নিয়েছেন মোটা কমিশন।
জানা গেছে, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খায়ের। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করেন খায়ের। দুর্নীতি-অনিয়মের টাকায় গড়ে তুলেছেন একাধিক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়েরের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। উল্টো বিভিন্ন প্রতিনিধি দিয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে নিউজ বন্ধ করতে জোর চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন।
এ বিষয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিকে ঠেকাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে জরুরি। আইন বা নিয়ম যতই থাকুক, যদি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ওপর কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে।
এ ব্যাপারে অপরাধ বিশেষজ্ঞ রাজু আহমেদ শাহ্ বলেন, আর্থিক স্বার্থ যেখানেই অগ্রাধিকার পায়, সেখানেই জনগণের সেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।








