নারীর নেশায় মগ্ন প্রকৌশলী বদরুল আলম

ব্যক্তিগত জীবন থেকে সরকারি প্রকল্পÑকোথাও যেন থামছে না অভিযোগ। একদিকে ২৫ বছরের দাম্পত্য, প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা, দ্বিতীয় বিয়ে ও একাধিক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি-বাণিজ্য, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিধি শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রকল্পের দরপত্র থেকে কর্মকর্তা বদলিÑবিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করেছেন কয়েকজন নারী ভুক্তভুগি।
বদরুল আলম খানের প্রথম স্ত্রী মিসেস জেসমিনের অভিযোগ, ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামীর কাছ থেকে তিনি চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। তাঁদের তিন কন্যাসন্তান রয়েছে। জেসমিনের দাবি, সংসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। স্বামীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি। এমনকি বাবার আচরণের কারণে তাঁদের ছোট মেয়েও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর।
অভিযোগের সঙ্গে একটি হাসপাতালের নথির কথাও সামনে এসেছে। জেসমিনের নামে ঢাকার হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ডিসচার্জ সার্টিফিকেট রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেন। অভিযোগকারীদের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে থাকার সময় স্বামীর অপেক্ষায় ছিলেন জেসমিন। কিন্তু তখন বদরুল আলম খান অন্যত্র অবস্থান করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
বদরুল আলম খানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে নারীঘটিত অভিযোগ। প্রথম স্ত্রীর অভিযোগ, দ্বিতীয় বিয়ের পাশাপাশি একাধিক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। বিভিন্ন ছবি, অডিও ও ভিডিওর বরাত দিয়ে এসব অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা করে অন্য নারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা এবং বিলাসী জীবনযাপন করতেন তিনি। নারীঘটিত সম্পর্ককে ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হতো। পরে সেই যোগাযোগকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি করে সুবিধা নিতেন এই প্রকৌশলী।
ব্যক্তিগত জীবনের অভিযোগের বাইরে বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি বলয় তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার কয়েকজন ঠিকাদারকে ঘিরে ওই বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
কুমিল্লার একটি দরপত্রে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ‘আসিফ’ নামের এক ঠিকাদারকে পুলিশের বিভিন্ন থানা ভবন নির্মাণসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্পের আরবরিকালচার কাজ বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য বিভাগের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করেছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেন।
পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানার ভবন নির্মাণের কাজও পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে। তবে তিনি শুনতে রাজি না হওয়ায় ওই নির্বাহী প্রকৌশলীকে নারীকে নিয়ে ব্লাকমেইলিং করে কাজ নিতে জোর চেষ্টা চালান বদরুল আলম। পরে তাতে কোনো কাজ না হওয়ায় ওই নির্বাহী প্রকৌশলীকে নারী ঘঠিত ঘটনায় জড়িয়ে শান্তির ব্যবস্থা করেন।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হলো অর্থ ও সম্পদ নিয়ে। অভিযোগে বলা হয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বদলি-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কমিশনের মাধ্যমে গত কয়েক মাসে প্রায় ১২২ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করা হয়েছে। ওই অর্থ নিজের নামে না রেখে আত্মীয়স্বজনের নামে রেখেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ্য করা হয়। বদরুল আলম খান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, খামারবাড়ি, ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে। আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ স্থানান্তর, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা এবং আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগও করা হয়েছে। বদলি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ ফেব্রুয়ারি সাভার সার্কেল থেকে ঢাকা গণপূর্ত-১ সার্কেলে বদলির ক্ষেত্রে অন্য কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করা হলেও প্রভাব খাটিয়ে নিজের পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করেন বদরুল আলম খান। বদলির পরও অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ সূত্র নিশ্চিত করেন। বদরুল আলম খানের অতীত কর্মজীবন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, সকাল সন্ধ্যা শয্যাসঙ্গী বদলান বদরুল স্যার। তার সব সময় খাবার মত করে নারী ব্যবহার করতে দেখা যায়। তিনি অফিসের মধ্য নারী নিয়ে আড্ডা দেন। অফিসের কাজ ফেলে নারীদের সঙ্গে আড্ডা মগ্ন থাকেন।
এ ব্যাপারে বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।








