নারীকে ‘হাতিয়ার’ করে গণপূর্তের বদরুলের টার্গেট কর্মকর্তা-ঠিকাদার

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। সরকারি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া ও নানা অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে নারীঘটিত যোগাযোগকে ব্যবহার করে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের চাপে ফেলার অভিযোগ। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন কয়েকজন ভুক্তভুগি।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলীর অভিযোগ , পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রথমে টার্গেট করা কর্মকর্তা কিংবা ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হতো। সম্পর্ক বা যোগাযোগ কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর শুরু হতো চাপ সৃষ্টির পালা। ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি দেখানো, ব্ল্যাকমেইল এবং শেষ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন তারা।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো ব্যক্তি এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে বিষয়টি ‘সমাধান’ করার নামে বদরুল আলমের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ, অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী ফাঁদ তৈরি থেকে শুরু করে ফাঁদ থেকে বের করে দেওয়ার মধ্যবর্তী পর্বেও ছিল প্রভাবশালী একটি যোগাযোগবলয়। ২০-২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবির অভিযোগ কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কাছে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি করা হয়েছে।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম দাবি করেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনকালে এক নারী তাকে ফোন করে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করেন। ওই নারীর সঙ্গে বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য বদরুল আলম তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও দাবি করেন আতিকুল। এই ঘটনার পর তাকে প্রথমে দায়িত্ব থেকে ক্লোজ এবং পরে খুলনায় বদলি করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, নারীঘটিত এসব অভিযোগ যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়া কাজ করেছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা কিংবা বড় ঠিকাদার।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, অর্থছাড় ও কাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের কথা বলে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পরে অর্থ ভাগাভাগি, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে বদরুল আলমের বিরুদ্ধে। কাজে অনিয়ম, সম্পদ অর্জন ও নারীঘটিত বিভিন্ন অভিযোগে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে বদলি করে রিজার্ভে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সাভার সার্কেলে দায়িত্ব পালনের পর নিজের আস্থাভাজন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে গাজীপুরে দায়িত্ব দেন বদরুল আলম। অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে প্রকল্পের কাজ ভাগ করে দেওয়া হতো। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিভিন্ন সম্পদের মালিকানা নিয়েও বদরুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব সম্পদের কিছু তার ভাই-বোনদের নামে রেখেছেন বদরুল আলমই বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে বদরুল আলমের অধীনে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৫ কোটি টাকার কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই সিভিল, ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায় ১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর থানা, ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া ও কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে বদরুল আলম প্রভাব বিস্তার করেছেন। নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের কাজ ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণেও বদরুল আলমের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে বলে জানা গেছে। কাজটি শেষ করতে আরও ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এ ছাড়া মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প এবং পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে বদরুল আলমকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ সব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয়। গতকাল সোমবার দুপুওে গিয়ে তার রুমে সাক্ষাত মিলেনি। এ ছাড়া আরো দুইদিন পার দপ্তরে গিয়ে তার সাক্ষাত মেলেনি। সব সময় বলা হয় তার মিটিং এ আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলছেন। দুর্নীতির আড়াল করতেই তারা এই কৌশল।








